বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের সময় মুনাফা বৃদ্ধির খবর, শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) এবং লভ্যাংশ ঘোষণার তথ্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদের সঞ্চার করে।
কাগজে-কলমে এসব সূচক অনেক ব্যাংকের সাফল্যের উজ্জ্বল চিত্র তুলে ধরলেও বাস্তবতা সবসময় এতটা আশাব্যঞ্জক নয়। আর্থিক প্রতিবেদনের আড়ালে প্রায়ই লুকিয়ে থাকে বিপুল খেলাপি ঋণ, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, মূলধন সংকট এবং প্রভিশন ঘাটতির মতো গভীর কাঠামোগত সমস্যা।
বর্তমানে ব্যাংক খাতে লাগামহীন খেলাপি ঋণের বিস্তার এবং ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের বিপরীতে নিয়মানুযায়ী প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থতার কারণে অনেক ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর তদারকি, নতুন হিসাবায়ন পদ্ধতি এবং আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের ফলে ধীরে ধীরে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত চিত্র সামনে আসছে। এতে দেখা যাচ্ছে, অনেক প্রতিষ্ঠান কাগজে-কলমে মুনাফা প্রদর্শন করলেও বাস্তবে তারা বিপুল প্রভিশন ঘাটতি, দুর্বল সম্পদমান এবং ক্রমবর্ধমান ঋণঝুঁকির চাপ বহন করছে। ফলে ঘোষিত মুনাফা ও প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে, যা বিনিয়োগকারী, আমানতকারী এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ এবং দেশের ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের প্রেক্ষাপটে এই সংকট আরও গভীর হয়েছে। কারণ একটি ব্যাংকের প্রকৃত শক্তি কেবল তার ঘোষিত মুনাফায় নয়, বরং সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে কতটা আর্থিক সুরক্ষা গড়ে তুলতে পেরেছে, তার ওপর নির্ভর করে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই স্বল্পমেয়াদি ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরার প্রয়োজনে প্রভিশন ঘাটতি আড়াল করার প্রবণতা দেখা যায়, যা ভবিষ্যতে আরও বড় আর্থিক ঝুঁকির জন্ম দিতে পারে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে গভীর আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ঋণ বিতরণ, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে ব্যর্থতার ফল এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। সাম্প্রতিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বহু ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থায় বড় ধরনের দুর্বলতা দেখা দিয়েছে, যা কাগজে-কলমে প্রদর্শিত মুনাফার সঙ্গে বাস্তবতার সুস্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরছে।
বর্তমানে ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিক শেষে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থতার কারণে মোট প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকায়। দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ প্রভিশন ঘাটতির রেকর্ড এবং প্রথমবারের মতো এ ঘাটতি ২ লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিকে যেখানে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা, সেখানে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে নতুন করে ১৪ হাজার ২২৩ কোটি টাকা যোগ হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে খেলাপি ঋণের চাপ ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় আর্থিক সুরক্ষা গড়ে তুলতে পারছে না।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় অংশ বহন করছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতি বর্তমানে প্রায় ৭৪ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা, যা সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। দীর্ঘদিনের দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, অনাদায়ী ঋণ পুনরুদ্ধারে ধীরগতি এবং সুশাসনের অভাব এই পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
একই সঙ্গে মূলধন সংকটও উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। বিভিন্ন আর্থিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০টিরও বেশি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর যে ন্যূনতম মূলধন থাকার কথা, অনেক প্রতিষ্ঠান তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। কয়েকটি ব্যাংকের মূলধন সক্ষমতা ইতোমধ্যে ঋণাত্মক বা নেগেটিভ অবস্থায় চলে গেছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বিস্তার। বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকারও বেশি, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৫ শতাংশের সমান। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব, যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ অনুমোদন এবং দুর্বল জবাবদিহিতা ব্যবস্থার কারণে বছরের পর বছর ধরে এই বিশাল খেলাপি ঋণের পাহাড় তৈরি হয়েছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতি ও পুঁজিবাজারে। উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং ক্রমবর্ধমান প্রভিশন ঘাটতির কারণে ব্যাংক শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে আরও অনেক ব্যাংক শেয়ারবাজারে নিম্নমানের বা ‘জেড’ (Z) ক্যাটাগরিতে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অন্যদিকে কিছু শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা ও আমানতকারীদের চাহিদা পূরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ তারল্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এই বাস্তবতায় কাগজে প্রদর্শিত মুনাফার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কারণ যেসব ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে অথবা বিশেষ নিয়ন্ত্রক সুবিধার আওতায় প্রভিশন স্থগিত রেখে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করছে, তাদের প্রকৃত লাভের চিত্র ঘোষিত হিসাবের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর লভ্যাংশ বিতরণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, যাতে কৃত্রিম মুনাফার ভিত্তিতে শেয়ারহোল্ডারদের বিভ্রান্ত করা না হয়।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, সম্ভাব্য ঋণ ক্ষতির বিপরীতে ব্যাংকগুলোর যে আর্থিক সুরক্ষা তহবিল গড়ে তোলার কথা, তার বড় অংশই বর্তমানে অনুপস্থিত। ফলে খেলাপি ঋণের চাপ আরও বাড়লে অনেক ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা, মূলধন সক্ষমতা এবং আমানতকারীদের নিরাপত্তা নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা, মূলধন ঘাটতি প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা এবং খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি—এই তিনটি পরিসংখ্যানই বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকটের প্রকৃত গভীরতা তুলে ধরে। যতদিন না খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর অগ্রগতি, ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন এবং শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ নিশ্চিত হচ্ছে, ততদিন কাগজে মুনাফার ঝলকানি দিয়ে ব্যাংক খাতের প্রকৃত সুস্থতা ও পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
একটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র বোঝার ক্ষেত্রে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী, খেলাপি বা ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট হারে অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়, যাতে ভবিষ্যতে ঋণ আদায় না হলে সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলা করা যায়। কিন্তু দীর্ঘদিনের দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-দুর্নীতি এবং প্রভাবশালী মহলের সুবিধাভোগী ঋণ বিতরণের কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। ফলে অনেক ব্যাংকের জন্য প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং তাদের আর্থিক বিবরণীতে বড় ধরনের প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
মূলত একটি ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা নির্ধারিত হয় সব ধরনের ব্যয় ও প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণের পর। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কিছু ব্যাংক বিশেষ নিয়ন্ত্রক সুবিধার আওতায় প্রভিশনের একটি অংশ পরবর্তী সময়ে সংরক্ষণের সুযোগ পেয়ে থাকে। এর ফলে আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফার চিত্র তুলনামূলক উজ্জ্বল দেখালেও প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল অবস্থায় থাকে। অর্থাৎ কাগজে যে লাভের হিসাব দেখা যায়, বাস্তবের ঝুঁকি ও দায় বিবেচনায় তা অনেক সময় পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর। ঘোষিত মুনাফা ও সম্ভাব্য লভ্যাংশের আশায় অনেকেই ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু পরে যখন ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক দুর্বলতা প্রকাশ পায়, তখন লভ্যাংশ কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়, শেয়ারের বাজারমূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ, বহু বিনিয়োগকারী আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন এবং ব্যাংক খাতের প্রতি বাজারের আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু ঘোষিত মুনাফা নয়, প্রভিশন ঘাটতি, খেলাপি ঋণের মাত্রা এবং মূলধনের শক্ত অবস্থানও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ব্যাংকিং খাতের ক্রমবর্ধমান প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন সংকট এবং খেলাপি ঋণের বিস্তার শুধু ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতাকেই দুর্বল করছে না, বরং সাধারণ আমানতকারীদের আস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ব্যাংকের মূল শক্তি হলো জনগণের আমানত। কিন্তু যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সেই আমানতের নিরাপত্তা নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাস ধরে রাখা এখন নীতিনির্ধারকদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সংকটের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কার্যক্রম শুরু না করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য ব্যাংক খাতে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক বিশেষজ্ঞ ব্যাংকিং খাতের সার্বিক অবস্থা মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার সুপারিশের জন্য একটি স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠনের পক্ষে মত দিয়েছেন, যাতে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের বাইরে থেকে খাতটির প্রকৃত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা যায়।
সংকট মোকাবিলার প্রথম শর্ত হলো প্রকৃত খেলাপি ঋণের সঠিক চিত্র তুলে ধরা। বছরের পর বছর ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন বা বিশেষ ছাড়ের মাধ্যমে সমস্যাকে সাময়িকভাবে আড়াল করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। প্রকৃত ঋণখেলাপিদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে বড় অঙ্কের অনাদায়ী ঋণ পুনরুদ্ধারে বিশেষায়িত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে, যাতে দীর্ঘসূত্রতা কমে এবং ব্যাংকগুলোর আটকে থাকা অর্থ দ্রুত অর্থনীতিতে ফিরে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে প্রয়োজনে পৃথক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (AMC) অথবা বিশেষায়িত ঋণ পুনরুদ্ধার কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা সমস্যাযুক্ত ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি আলাদা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হবে, যা ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিটকে তুলনামূলকভাবে সুস্থ করতে সহায়তা করবে।
অন্যদিকে, ব্যাংক পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা সময়ের দাবি। ঋণ অনুমোদন, পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে নতুন করে একই সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং মানদণ্ড, বিশেষ করে বাজেল-৩ (Basel III) নির্দেশনার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার করার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর মূলধন সক্ষমতা, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রভিশন সংরক্ষণের বিষয়গুলো কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কোনো ব্যাংক যাতে প্রভিশন ঘাটতি আড়াল করে বা নিয়ন্ত্রক শিথিলতার সুযোগ নিয়ে কৃত্রিম মুনাফা প্রদর্শন করতে না পারে, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট শুধু আর্থিক সংখ্যার সংকট নয়; এটি আস্থা, সুশাসন এবং জবাবদিহিতারও সংকট। তাই প্রকৃত খেলাপি ঋণ আদায়, প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি দূরীকরণ, স্বচ্ছ হিসাবায়ন এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতকে টেকসই ও বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তির ওপর পুনর্গঠন করাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফার অঙ্ক যতই আকর্ষণীয় দেখাক না কেন, প্রকৃত চিত্র বোঝার জন্য প্রভিশন ঘাটতি, খেলাপি ঋণ এবং মূলধন সক্ষমতার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। কারণ কাগজে দেখানো লাভ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দুর্বল আর্থিক ভিত্তি কোনো ব্যাংককে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে পারে না। তাই ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে কৃত্রিম মুনাফার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সুশাসন, স্বচ্ছতা, খেলাপি ঋণ আদায় এবং যথাযথ প্রভিশন সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় মুনাফার ঝলকানির আড়ালে লুকিয়ে থাকা সংকট একসময় পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে

