দেশের ব্যাংক খাতে দুর্দশাগ্রস্ত বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ নতুন রেকর্ড ছুঁয়েছে। সাম্প্রতিক হিসাবে এ অঙ্ক দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকায়। এক বছরে এ ধরনের ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা, যা আর্থিক খাতের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ এখন উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে মূলধন পর্যাপ্ততার সূচক নেতিবাচক পর্যায়ে নেমে যাওয়ায় পুরো খাতের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর যে পরিমাণ মূলধন থাকা দরকার, বাস্তবে তার বিপরীতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, শুধু খেলাপি ঋণ নয়, পুনর্গঠিত ঋণের অনাদায়ী অংশ এবং অবলোপন করা অনাদায়ী ঋণ মিলিয়েই এই দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের হিসাব তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, যেসব ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুবই কম, সেগুলো একত্র করে এই বড় অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত অনুযায়ী তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গত কয়েক বছরে এই সমস্যার ধারাবাহিক বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগের বছরও দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল, আর চলতি প্রতিবেদনে আরও বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ঋণ ব্যবস্থাপনায় শিথিলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং পুনঃতপশিলের মাধ্যমে প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করার প্রবণতা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মোট ঋণস্থিতি এখন আঠারো লাখ কোটির বেশি। এর মধ্যে বিপুল অংশই অনাদায়ী বা উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকার ওপরে পৌঁছেছে। পাশাপাশি পুনঃতপশিল করা ঋণের বড় অংশই এখনো পরিশোধ হয়নি, যা ভবিষ্যতে আরও চাপ তৈরি করতে পারে।
অতীতে বিভিন্ন সময়ে ঋণ নিয়মিত দেখানোর জন্য সহজ শর্তে পুনঃতপশিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কখনো খুব সামান্য ডাউন পেমেন্টে, আবার কখনো দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ পুনর্গঠনের মাধ্যমে অনেক ঋণই সাময়িকভাবে ভালো দেখানো হয়। তবে পরবর্তীতে সেসব ঋণের বড় অংশ আবার অনাদায়ী হয়ে পড়ে, যার প্রভাব এখন পুরো ব্যাংক খাতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো মূলধন ঘাটতি। ব্যাংক খাতে যে পরিমাণ শক্তিশালী মূলধন থাকার কথা, বাস্তবে তা ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমে এসেছে। বিশেষ করে কয়েকটি বড় ব্যাংকের দুর্বল অবস্থান পুরো খাতের গড় সূচককে নিচে নামিয়ে দিয়েছে। এর ফলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঋণ ফেরত পাওয়ার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ইসলামী ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতিও বিশেষভাবে দুর্বল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা ব্যাপকভাবে কমে নেতিবাচক অবস্থায় পৌঁছেছে। কিছু ব্যাংককে হিসাবের বাইরে রাখলে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো হলেও সামগ্রিকভাবে ঝুঁকি এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
তরলতা পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে মূলধন সংকট ও অনাদায়ী ঋণের চাপ ব্যাংক খাতকে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তাদের মতে, কঠোর ঋণ শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে দেশের ব্যাংক খাত এখন এক জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ঋণ ফেরত না আসার হার বাড়তে থাকায় আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

