বহু বছরের অনিয়ম, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের প্রভাবে দেশের ব্যাংকিং খাত এখন গভীর সংকটের মুখে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিআরএআর) ঋণাত্মক অবস্থায় নেমে গেছে। অর্থাৎ সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলার জন্য ব্যাংকগুলোর যে আর্থিক সুরক্ষা থাকার কথা, তার বড় অংশই ক্ষয়ে গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকিং খাতের সিআরএআর দাঁড়িয়েছে মাইনাস ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে। এক বছর আগেও এই হার ছিল ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে ন্যূনতম ১০ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। এর সঙ্গে অতিরিক্ত ২ দশমিক ৫ শতাংশ সুরক্ষা বাফারও রাখতে হয়। সেই তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন উদ্বেগজনকভাবে নিচে নেমে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা দীর্ঘদিন পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন ব্যাংকের গোপন খেলাপি ঋণ, অনিয়ম ও আর্থিক দুর্বলতার চিত্র সামনে আসতে শুরু করে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি দ্রুত বেড়ে যায় এবং সামগ্রিক খাতের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই সময়ে ভারতের ব্যাংক খাতে মূলধন পর্যাপ্ততার হার ছিল ১৭ শতাংশের বেশি, পাকিস্তানে ২০ শতাংশের ওপরে এবং শ্রীলঙ্কায় প্রায় ১৯ শতাংশ। বিপরীতে বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যেখানে এ সূচক ঋণাত্মক অবস্থায় পৌঁছেছে।
ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করেছে খেলাপি ঋণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। চলতি বছরের মার্চ শেষে এই অঙ্ক আরও বেড়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণাত্মক মূলধন পর্যাপ্ততা শুধু একটি পরিসংখ্যানগত সমস্যা নয়; এটি পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। ব্যাংকের মূলধন কমে গেলে নতুন ঋণ বিতরণ, বিনিয়োগ সহায়তা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থ জোগানের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৪২টি এখনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মূলধন সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক এবং কিছু শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের বড় ধরনের মূলধন ঘাটতির কারণে পুরো খাতের গড় পরিস্থিতি নেতিবাচক হয়ে গেছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল সরকারি সহায়তা বা নতুন মূলধন জোগান দিয়ে এই সংকট কাটানো সম্ভব হবে না। প্রয়োজন কঠোর তদারকি, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর কার্যকর পুনর্গঠন। অন্যথায় খেলাপি ঋণের চাপ ভবিষ্যতে আরও বড় আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সরকার ইতোমধ্যে ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করতে চলতি অর্থবছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে সমস্যাগ্রস্ত কয়েকটি ব্যাংক একীভূতকরণ ও পুনর্গঠনের উদ্যোগও রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কঠোর সংস্কারই হবে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
ব্যাংক খাতে জমে থাকা সংকট এখন শুধু ব্যাংকের সমস্যা নয়; এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। তাই দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

