বিশ্ব খাদ্যবাজার আবারও বড় ধরনের অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সক্রিয় হওয়া এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতি কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও সারের বাজারে তৈরি হওয়া চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে আগামী মাসগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হতে পারে। কোথাও খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি, আবার কোথাও তাপপ্রবাহের মতো পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। এসব কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে খাদ্যবাজার একাধিক ঝুঁকির মুখোমুখি। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় জ্বালানি পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থা চাপের মধ্যে রয়েছে, অন্যদিকে সারের মূল্যও উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। কৃষি উৎপাদনের জন্য এই দুটি উপাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি অনেক অঞ্চলে কৃষিকাজও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্বব্যাংক মনে করছে, এল নিনোর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হলে খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ে পূর্ববর্তী পূর্বাভাসগুলোও অতিক্রম করতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়বে। আফ্রিকার সাহারা-সংলগ্ন অঞ্চলের বহু দেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও ক্রমেই বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৯ শতাংশ থাকলেও ২০২৬ সালে তা কমে ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। মহামারী-পরবর্তী সময়ে এটি হবে সবচেয়ে ধীরগতির অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের অন্যতম একটি পর্যায়।
এরই মধ্যে জাপানের আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহ থেকে এল নিনো পরিস্থিতি কার্যকরভাবে শুরু হয়েছে। ফলে আবহাওয়ার পরিবর্তনজনিত প্রভাব আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বিভিন্ন অঞ্চলে দৃশ্যমান হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কৃষকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে সারের উচ্চমূল্য। অনেক দেশে কৃষকরা উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। এর সঙ্গে যদি প্রতিকূল আবহাওয়া যুক্ত হয়, তাহলে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। উৎপাদন কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকুচিত হবে এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বাড়বে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আবহাওয়াজনিত ক্ষতি ও কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি একসঙ্গে ঘটলে তার প্রভাব সাধারণত অনেক বেশি তীব্র হয়। এতে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতাও দেখা দিতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির কৃষি ব্যবস্থা মূলত মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হলে ধান, গমসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফসলের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
তবে এল নিনোর প্রভাব সব দেশের জন্য নেতিবাচক হবে না। কিছু অঞ্চলে অনুকূল আবহাওয়া তৈরি হওয়ার কারণে শস্য উৎপাদন বাড়তেও পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি কৃষিপ্রধান দেশ সম্ভাব্যভাবে বাড়তি উৎপাদনের সুবিধা পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঐতিহাসিক তথ্য বলছে, শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব সাধারণত এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, এল নিনো শুরু হওয়ার প্রায় ১৬ মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক খাদ্যপণ্যের দাম সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে, যেখানে মানুষের আয়ের বড় অংশ খাদ্য কেনার পেছনে ব্যয় হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখতে হতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা সম্ভব হলেও বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে এল নিনো এখন শুধু আবহাওয়ার একটি ঘটনা নয়, বরং বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।

