দেশের ব্যাংক খাতে ঋণ ঝুঁকি উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১০টি ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের প্রায় অর্ধেকই এখন ঝুঁকিভিত্তিক শ্রেণিতে রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত ‘ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এসব ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের একই সময়ে এই হার ছিল ৪২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ফলে এক বছরের ব্যবধানে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ আরও বেড়েছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঋণের এই চিত্র তুলে ধরা হলেও সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যাংকের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
ব্যাংক খাত বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠান বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করলেও সেগুলোর বড় অংশ সময়মতো পরিশোধ করা হয়নি। এর ফলে অনেক ঋণ ধীরে ধীরে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক ঝুঁকি বেড়েছে।
ব্যাংকারদের অভিযোগ, বড় শিল্পগোষ্ঠী কিংবা তাদের সুবিধাভোগী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রচলিত নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। বিশেষ করে একক গ্রাহকের জন্য নির্ধারিত ঋণসীমাসহ বিভিন্ন নিয়ম উপেক্ষা করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। অনেক ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত মালিকানা বা সংশ্লিষ্টতা সরাসরি দৃশ্যমান ছিল না।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু গোষ্ঠী কাগজে-কলমে পৃথক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহের নানা উপায় গ্রহণ করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা, সে বিষয়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্ব পায়নি।
ব্যাংকাররা আরও জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঋণখেলাপির তথ্য নতুন করে হালনাগাদ করা হয়েছে। এর ফলে আগে আড়ালে থাকা অনেক অনিয়ম প্রকাশ্যে এসেছে। একই সঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারের সময় দেওয়া কিছু বিশেষ সুবিধা বাতিল হওয়ায় নতুন নতুন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামও খেলাপি ঋণের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
ব্যাংক খাতে আলোচিত শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এস আলম গ্রুপের নামও উঠে এসেছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনায় এই গোষ্ঠীর প্রভাব ছিল বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ ওঠে। সাবেক গভর্নর আহসান মনসুরের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ব্যাংক থেকে বিভিন্ন উপায়ে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে।
শুধু বেসরকারি ব্যাংক নয়, সরকারি ব্যাংক থেকেও নেওয়া ঋণের বড় অংশ পরিশোধ না করায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তুত করা শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় বর্তমানে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রামভিত্তিক এই শিল্পগোষ্ঠী।

