এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আটকে থাকা আমানত ফেরতের অপেক্ষায় থাকা হাজারো গ্রাহকের জন্য আশার খবর এসেছে। সংকটে ডুবে থাকা পাঁচটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথম ধাপে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তায় থাকা পরিবারগুলোর জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, কার্যত অচল হয়ে পড়া পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সেখানে প্রশাসক নিয়োগ করা হবে। এরপর প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ, দায়-দেনা ও আর্থিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করে অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে। একই সঙ্গে ধাপে ধাপে আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধের কার্যক্রমও চালু করা হবে।
যেসব প্রতিষ্ঠান এই প্রক্রিয়ার আওতায় আসছে, সেগুলো হলো এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ হাজার ব্যক্তি আমানতকারীর প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে অনেকে তাদের জীবনভর সঞ্চয় ফেরত না পেয়ে মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে যাদের আমানত ১০ লাখ টাকা বা তার কম, তারা সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন। আর যাদের আমানত এর চেয়ে বেশি, তারাও চাইলে প্রাথমিকভাবে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত তুলে নিতে পারবেন। পরবর্তী সময়ে অবশিষ্ট অর্থ কীভাবে পরিশোধ করা হবে, সে বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সীমিত সম্পদ ও বিপুল দায়ের বাস্তবতায় প্রথমে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা দেওয়াই সবচেয়ে যৌক্তিক পদক্ষেপ। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানে আমানত রাখা অনেক মানুষ অবসরকালীন সঞ্চয়, প্রবাসী আয় কিংবা পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য জমা রাখা অর্থ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছিলেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু অর্থ ফেরতের উদ্যোগ নয়; এটি আর্থিক খাতে আস্থা পুনর্গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা অর্থ ফেরত দিতে পারলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশ্বাস কিছুটা হলেও ফিরতে পারে।
তবে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে, ১০ লাখ টাকার বেশি আমানতধারীরা কখন এবং কীভাবে তাদের পুরো অর্থ ফেরত পাবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, প্রশাসক নিয়োগের পর প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ, উদ্ধারযোগ্য ঋণ, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এবং সম্ভাব্য নগদ প্রবাহ মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী রোডম্যাপ নির্ধারণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবসায়ন প্রক্রিয়ায় সাধারণত প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি, খেলাপি ঋণ আদায় এবং বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে পাওনাদারদের টাকা পরিশোধ করা হয়। ফলে বড় অঙ্কের আমানত ফেরতের বিষয়টি সময়সাপেক্ষ হতে পারে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি তদারকি থাকায় আগের তুলনায় একটি সুসংগঠিত ও স্বচ্ছ কাঠামো গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
আমানতকারীদের প্রতিনিধিরা বলছেন, ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষার উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। তবে একই সঙ্গে ছোট-বড় সব আমানতকারীর জন্য একটি সময়বদ্ধ, স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন অর্থ ফেরত পরিকল্পনা ঘোষণা করা প্রয়োজন। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকার হয়েছেন সব ধরনের গ্রাহকই।
এই সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যাপক ঋণ কেলেঙ্কারি। বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এসব প্রতিষ্ঠান থেকে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ বেরিয়ে যায়। পরবর্তীতে অধিকাংশ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো আমানত ফেরতের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ প্রতিষ্ঠানের প্রায় পুরো ঋণপোর্টফোলিওই এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৯৯ শতাংশেরও বেশি। ফলে কার্যত ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা হারিয়ে তারা দেউলিয়া অবস্থায় পৌঁছেছে।
প্রশাসক নিয়োগের পর প্রতিষ্ঠানগুলোর সব সম্পদ, মামলা, উদ্ধারযোগ্য ঋণ এবং দায়-দেনার বিস্তারিত তালিকা তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত আমানতকারীদের তথ্য যাচাই করে অর্থ ফেরতের তালিকা প্রস্তুত করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, লোকসানি প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার চেয়ে দ্রুত অবসায়নের মাধ্যমে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা বেশি কার্যকর হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সরকারি অর্থ দিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা ফেরত দিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। যেসব ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অর্থ আত্মসাতের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়েছে, তাদের সম্পদ শনাক্ত ও জব্দ করে অর্থ পুনরুদ্ধার করাও জরুরি। অন্যথায় জনগণের করের অর্থ ব্যয় হলেও দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান সম্প্রতি জানিয়েছেন, দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ঝুলে থাকা এই সমস্যার সমাধানে দৃশ্যমান অগ্রগতি খুব শিগগিরই দেখা যাবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর হাজারো আমানতকারীর অর্থ ফেরতের পথ উন্মুক্ত হবে। তবে বড় অঙ্কের আমানতধারীদের পুরো অর্থ ফেরতের সময়সূচি ও পদ্ধতি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
আর্থিক খাতের পর্যবেক্ষকদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে শুধু ২৭ হাজার আমানতকারীর দুর্ভোগ কমবে না, ভবিষ্যতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় শৃঙ্খলা, জবাবদিহি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

