দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের চাহিদা বাড়ায় এ খাতের সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহী। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এ খাতে প্রয়োজনীয় সুযোগ ও কাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে।
রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ইসলামী ব্যাংকিং সম্প্রসারণ, মুদ্রানীতির কাঠামো পরিবর্তন এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমসহ কমিটির সদস্যরা অংশ নেন। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে প্রতি ছয় মাসের পরিবর্তে তিন মাস পরপর মুদ্রানীতি ঘোষণা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। জাতীয় নাগরিক পার্টির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এ প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি গ্রহণযোগ্য একটি পরামর্শ এবং বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে আলোচনা করেন জামায়াতের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, বর্তমানে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যাংকিং কার্যক্রম ইসলামী ব্যাংকিংয়ের আওতায় রয়েছে। তবে তাঁর ধারণা, দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহী। মানুষের এই চাহিদা পূরণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে।
তিনি বলেন, গত এক দশকে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ ছিল শরিয়াহ বোর্ডের দুর্বলতা। এখন এসব বোর্ডকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শরিয়াহ বোর্ডের ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বাড়ানোর বিষয়েও কাজ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উপস্থাপনায় বলা হয়, সরকার ঘোষিত এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে একটি আধুনিক ও কার্যকর মুদ্রানীতি কাঠামো প্রয়োজন। এ জন্য প্রচলিত সুদের হারভিত্তিক মুদ্রানীতি থেকে ধীরে ধীরে মূল্যস্ফীতি-লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতির দিকে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, বিশ্বের অনেক উদীয়মান অর্থনীতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে সফল হয়েছে। বাংলাদেশও ধাপে ধাপে এ ধরনের কাঠামোর দিকে এগোতে পারে।
উপস্থাপনায় ইসলামী ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মতো ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য এখনো কার্যকর আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার গড়ে ওঠেনি। এ বাজার উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে।
বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় ইসলামিক ব্যাংক লিকুইডিটি সাপোর্ট, মুদারাবা লিকুইডিটি সাপোর্ট এবং বিশেষ তারল্য সহায়তা ব্যবস্থার ব্যবহার করা হচ্ছে। অতিরিক্ত তারল্য ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট বন্ড ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার উন্নয়নে শুধু কার্যক্রম সম্প্রসারণ নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকেও শক্তিশালী করা হবে। বিশেষ করে শরিয়াহভিত্তিক পরিচালনা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বৈঠকে দেশের অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ নিয়েও আলোচনা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগে ধীরগতি এবং বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া অর্থনীতির বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়া বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বৈদেশিক বাণিজ্যে চাপ এবং সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের আশঙ্কার কথাও তুলে ধরা হয়।
তবে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি দেশের বহিঃখাতের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই প্রবাহ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সম্প্রসারণের পাশাপাশি শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছ পরিচালনা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখতে হলে শুধু চাহিদা নয়, সুশাসন ও জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

