ব্যাংকগুলোর শাখা, উপশাখা, বুথ ও অন্যান্য ব্যবসায়িক কেন্দ্র স্থাপনে নতুন নিয়ম চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে শহর এলাকায় একটি ব্যাংক শাখার সর্বোচ্চ আয়তন হতে পারবে ৬ হাজার বর্গফুট, আর গ্রামীণ এলাকায় সর্বোচ্চ ৩ হাজার বর্গফুট।
একই সঙ্গে ব্যাংক ভবনের ভাড়া, অগ্রিম অর্থ প্রদান, নিরাপত্তা জামানত, অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার ব্যয় এবং শাখা স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও নতুন সীমা নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যাংকিং সেবার ভারসাম্য নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে ‘ব্যাংক ব্যবসা কেন্দ্র স্থাপন, স্থানান্তর, ভাড়া/ইজারা গ্রহণ ও চুক্তি নবায়ন সংক্রান্ত নীতিমালা’ জারি করা হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকের উপশাখার আয়তন সর্বোচ্চ ১ হাজার বর্গফুট, কালেকশন বুথ ৩৫০ বর্গফুট এবং এটিএম বুথ ১০০ বর্গফুটের মধ্যে রাখতে হবে।
নতুন নিয়মে ব্যাংক ভবনের ভাড়া চুক্তির ক্ষেত্রেও কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। কোনো ভবন ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে চুক্তির মেয়াদ কমপক্ষে ছয় বছর হতে হবে। চুক্তির প্রথম তিন বছরে কোনো ধরনের ভাড়া বৃদ্ধি করা যাবে না। পরবর্তী সময়ে ভাড়া বাড়ানো হলেও তা প্রাথমিক ভাড়ার সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
এ ছাড়া ভবনের সার্ভিস চার্জ মূল ভাড়ার ১০ শতাংশের বেশি নেওয়া যাবে না। কোনো এলাকায় প্রচলিত ভাড়ার তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি দামে ভবন ভাড়া নেওয়া যাবে না বলেও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অগ্রিম অর্থ ও নিরাপত্তা জামানতের ক্ষেত্রেও সীমা নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মাসিক ভাড়ার সঙ্গে সমন্বয়যোগ্য অগ্রিম অর্থ চুক্তির মেয়াদ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৮ থেকে ৩০ মাসের ভাড়ার সমপরিমাণ হতে পারবে। আর চুক্তি শেষে ফেরতযোগ্য নিরাপত্তা জামানত হিসেবে সর্বোচ্চ ছয় মাসের ভাড়ার সমপরিমাণ অর্থ রাখা যাবে।
কোনো ব্যাংকের পরিচালক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মালিকানাধীন ভবন ভাড়া নেওয়া হলে তা আবেদনপত্রে উল্লেখ করতে হবে। পাশাপাশি একই এলাকার অন্যান্য ভবনের তুলনায় ওই ভবনের ভাড়া বেশি হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
নতুন শাখা, উপশাখা, কালেকশন বুথ এবং বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় বুথ চালুর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন নিতে হবে। একইভাবে শাখা একীভূত করা, রূপান্তর, বন্ধ করা কিংবা স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
তবে এটিএম, সিআরএম ও সিডিএম বুথ, এক মাসের কম সময়ের অস্থায়ী বুথ এবং বিমানবন্দর লাউঞ্জ স্থাপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন প্রয়োজন হবে না। এসব ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বা নির্বাহী কমিটির অনুমোদন যথেষ্ট হবে। তবে স্থাপনের এক সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিষয়টি জানাতে হবে।
ব্যাংকের নতুন ব্যবসা কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় প্রতি বর্গফুটে সর্বোচ্চ ২ হাজার ২০০ টাকা ব্যয় করা যাবে। আর কোনো শাখা স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ইন্টেরিয়র ব্যয়ের সীমা থাকবে প্রতি বর্গফুটে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬০০ টাকা।
শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যাংকিং সেবার ভারসাম্য বজায় রাখতে নতুন শাখা খোলার ক্ষেত্রেও অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন থেকে বছরে যতগুলো নতুন শাখা খোলা হবে, তার অন্তত ৫০ শতাংশ গ্রামীণ এলাকায় হতে হবে। একই বছরে একই শহরে একটির বেশি নতুন শাখা খোলা যাবে না। পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকার কোনো শাখা শহরে স্থানান্তর করার সুযোগ থাকবে না।
সান্ধ্যকালীন ব্যাংকিং সেবার ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম করা হয়েছে। এ ধরনের সেবা চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে। স্বাভাবিক ব্যাংকিং সময়ের বাইরে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা এই কার্যক্রম চালানো যাবে। তবে এ সময়ে শুধু নগদ অর্থ জমা নেওয়া যাবে, অন্য কোনো ব্যাংকিং লেনদেন করা যাবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, নতুন নীতিমালার শর্ত লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানাসহ প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভুল তথ্য দিয়ে অনুমোদন নেওয়া বা নিয়ম না মেনে শাখা স্থানান্তর করা হলে ওই ব্যবসা কেন্দ্রের অনুমোদন বাতিল করার ক্ষমতাও থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংকের।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে ব্যাংকগুলোর অপ্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় কমবে, একই সঙ্গে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবার বিস্তার আরও বাড়বে। এতে একদিকে ব্যাংকগুলোর দক্ষতা বাড়বে, অন্যদিকে গ্রাহকরাও আরও পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল সেবা পাবেন।

