বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকঋণের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্বার্থে সরকারি অর্থায়নের কাঠামোয় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। এ কারণে ব্যাংকঋণের বিকল্প উৎস খুঁজে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রোববার রাজধানীতে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী সংলাপে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, গবেষক ও নীতিনির্ধারকেরা প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।
সংলাপে আলোচকরা বলেন, নতুন অর্থবছরের বাজেটের আকার বড় হলেও রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি পূরণে বিপুল পরিমাণ ব্যাংকঋণের পরিকল্পনা বেসরকারি খাতের জন্য চাপ তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নিলে শিল্প ও ব্যবসা খাত প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পেতে সমস্যায় পড়বে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের গতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
এই উদ্বেগের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি খাতের অর্থায়ন সংকটের আশঙ্কা অমূলক নয়। সরকারও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তিনি জানান, চলতি বাজেট থেকেই ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে এটি একদিনে সম্ভব নয়। ধাপে ধাপে সরকারি অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যময় করা হবে।
সরকারি অর্থায়নের বিকল্প হিসেবে বন্ডবাজারসহ দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহের বিভিন্ন পথ বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তার ভাষ্য, দেশের অর্থনীতিকে আরও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের বাইরে যেতে হবে। একই সঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়িয়ে রাজস্বভিত্তি শক্তিশালী করাও জরুরি।
সংলাপে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, রাজস্ব আদায়ের সাম্প্রতিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য অত্যন্ত উচ্চ হারে প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি আরও বলেন, বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় পরীক্ষার মুখে পড়বে। কারণ, উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুত অর্থ সময়মতো ছাড় করানো সবসময় সহজ নয়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপের মুখোমুখি হয়েছে। অতীতের ঋণ দায় পরিশোধেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে শুধু ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধেই প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। ফলে উন্নয়ন ব্যয় ও আর্থিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর সীমিত সময়ের মধ্যে বাজেট প্রণয়ন করতে হয়েছে। তবু ব্যবসার ব্যয় কমানো, প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও সহায়তার বিষয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থনীতিবিদরা বলেন, দেশের অর্থনীতির সামনে এখন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে। তারা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদার, অপচয় ও দুর্নীতি কমানো এবং সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাজেট বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা বাড়ানোর জন্য নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ এবং ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনার প্রস্তাবও দেন আলোচকরা। তাদের মতে, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান কমাতে হলে স্বচ্ছতা ও নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে সম্পদ কর এবং উত্তরাধিকার কর চালুর প্রস্তাবও উঠে আসে সংলাপে। আলোচকদের মতে, উচ্চ সম্পদধারীদের ওপর ন্যায়সঙ্গত কর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে রাজস্ব আয় বাড়বে এবং সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। তারা বলেন, উৎপাদন ব্যাহত হলে শিল্প খাতের পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়। তবে গ্যাস অনুসন্ধান, সরবরাহ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ শুরু করেছে।
তিনি আরও জানান, ব্যবসা পরিচালনা সহজ করতে বিদ্যমান নিয়ম-কানুন সরলীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং হয়রানির অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। পাশাপাশি একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করা হবে, যেখানে ব্যবসায়ীরা প্রশাসনিক জটিলতা বা অনিয়মের অভিযোগ জানাতে পারবেন।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, সরকার উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়াতে প্রকল্প পুনর্বিন্যাসের কাজ করছে। পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন খাতে বেশি সম্পদ বরাদ্দের মাধ্যমে অর্থনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যে শেষ করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংলাপে অংশ নেওয়া বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা, ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এখন সময়ের অন্যতম প্রধান দাবি।

