খেলাপি ঋণের জামিনদার হিসেবে আইনি বিধিনিষেধের মুখে থাকা আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেডকে বিশেষ সুবিধার আওতায় ১০০ শতাংশ মার্জিনে ঋণপত্র (এলসি) খোলার অনুমতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা, কাঁচামাল আমদানি অব্যাহত রাখা এবং দেশের চিনির সরবরাহ ব্যবস্থায় সম্ভাব্য সংকট এড়াতেই এ পদক্ষেপ বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে আনুষ্ঠানিক মতামত ও অনুমোদন চেয়েছে। সরকারের সম্মতি মিললে আগামী ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিকে বিশেষ ছাড় দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকে থাকা একটি বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের করপোরেট গ্যারান্টর। সংশ্লিষ্ট ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৫৫ কোটি টাকা। বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের জামিনদাররাও খেলাপি হিসেবে গণ্য হন। ফলে তারা নতুন ঋণ সুবিধা গ্রহণ বা এলসি খোলার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের আওতায় থাকেন।
তবে একই আইনে বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকারের সঙ্গে পরামর্শক্রমে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে এই বিধিনিষেধ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেই আইনি ক্ষমতাই প্রয়োগ করতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ইতিবাচক মত দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। অনুমোদন না এলে বিশেষ সুবিধা কার্যকর হবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশের ২৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আব্দুল মোনেম লিমিটেডের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওনা রয়েছে অগ্রণী ব্যাংকের। ঋণ পুনর্গঠনের জন্য গ্রুপটির পক্ষ থেকে আগেই আবেদন করা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শোধনাগারটির পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে অপরিশোধিত চিনি আমদানির জন্য আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের সঙ্গে বিদ্যমান কয়েকটি চুক্তি এখনো কার্যকর রয়েছে। প্রয়োজনীয় এলসি খুলতে না পারলে চুক্তিভঙ্গের কারণে প্রতিদিন প্রায় ২৩ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ গুনতে হতে পারে। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশের চিনির বাজারেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে শোধনাগারটি পরিচালনা করছে আবুল খায়ের লিমিটেড। একটি ক্রয়চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং এখানকার উৎপাদিত চিনি ‘স্টারশিপ সুগার’ নামে বাজারজাত হচ্ছে। তবে মালিকানা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।
আব্দুল মোনেম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএসএম মঈনউদ্দিন মোনেম জানিয়েছেন, ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে ব্যাংক ঋণ ও বন্ড-সংক্রান্ত দায়দায়িত্ব পরিশোধ করবে। তবে মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চলমান থাকায় ব্যাংকগুলো ঋণ আদায় নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকগুলো নতুন অর্থায়ন থেকে বিরত রয়েছে। গত প্রায় দেড় বছরে কোনো নতুন ঋণ সুবিধা না পাওয়ায় ব্যবসা পরিচালনায় চাপ বেড়েছে। একই সময়ে নির্মাণ খাতের ধীরগতি ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ গ্রুপটির সামগ্রিক কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে খেলাপি ঋণ আদায়ের স্বার্থ রক্ষা, অন্যদিকে শিল্প উৎপাদন ও বাজার সরবরাহ সচল রাখা—এই দুই লক্ষ্যকে সমন্বয় করেই সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ দেশের বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হলে শুধু সংশ্লিষ্ট কোম্পানিই নয়, সরবরাহ ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং বাজারমূল্যের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

