আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক হিসাব পরিচালনা ও কর ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত করার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী। প্রস্তাব অনুযায়ী, কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণি ছাড়া নতুন ব্যাংক হিসাব খুলতে হলে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) সনদ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হবে।
বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী জানান, শিক্ষার্থীদের জন্য চালু স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট এবং স্বল্প জমায় খোলা নো-ফ্রিলস হিসাবের ক্ষেত্রে এ বাধ্যবাধকতা থাকবে না। একইভাবে কৃষক, মুক্তিযোদ্ধা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতা গ্রহণকারী ব্যক্তি এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পক্ষ থেকে অব্যাহতি পাওয়া ব্যক্তিরাও এই শর্তের বাইরে থাকবেন। তবে এসব শ্রেণির বাইরে থাকা সব গ্রাহকের জন্য ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন সনদ আবশ্যক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু নতুন হিসাব নয়, বর্তমানে চালু থাকা ব্যাংক হিসাব সচল রাখার ক্ষেত্রেও প্রস্তাবিত আইনের বিধান কার্যকর হবে বলে বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া আর্থিক ও প্রশাসনিক তথ্য ব্যবস্থাকে একীভূত করার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় তথ্য সংযুক্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে এনবিআরের তথ্যভাণ্ডারকে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক, ইউটিলিটি সেবা প্রতিষ্ঠান, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। এর ফলে প্রয়োজনীয় তথ্য বিনিময় আরও সহজ ও দ্রুত হবে।
কেন আনা হচ্ছে এই প্রস্তাব:
প্রস্তাবের সমর্থকদের মতে, ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে টিআইএন যুক্ত হলে গ্রাহক পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হবে। এতে ব্যাংকিং খাতে অবৈধ অর্থপ্রবাহ, অর্থ পাচার এবং সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
তাদের যুক্তি, বেনামি বা অস্পষ্ট পরিচয়ের হিসাব কমে গেলে অর্থনীতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবও হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে অর্থের প্রবাহ আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্যে আসবে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে সহায়ক হতে পারে। এর ফলে করদাতার সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি রাজস্ব আহরণও বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, দেশের সঞ্চয় ব্যবস্থার প্রধান কেন্দ্র ব্যাংক খাত। ফলে এই খাতে স্বচ্ছতা বাড়লে কর ফাঁকি ও তথ্য গোপনের সুযোগও সীমিত হবে।
তবে প্রস্তাবটি ঘিরে বিভিন্ন মহল থেকে আপত্তিও উঠেছে। সমালোচকদের মতে, টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের অনেক মানুষ ব্যাংকিং সেবার বাইরে চলে যেতে পারেন। এতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির যে লক্ষ্য সরকার দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে, তা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের মতে, ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাংকিং সেবার প্রতি অনাগ্রহ বাড়তে পারে। এর ফলে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প ও অনানুষ্ঠানিক উপায়ে অর্থ লেনদেনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে, যার মধ্যে হুন্ডিও রয়েছে।
সমালোচকদের আরেকটি উদ্বেগ হলো, ব্যাংক খাত বর্তমানে আস্থা ও তারল্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন এই বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হলে সংকট আরও গভীর হতে পারে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে প্রবাসী আয় প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, সরকার যে নগদবিহীন বা ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য সামনে রেখেছে, টিআইএন বাধ্যতামূলক করার এই উদ্যোগ সেই লক্ষ্য অর্জনের পথেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে টিআইএন সংযুক্তির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা মূলত করজাল সম্প্রসারণ, আর্থিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং অবৈধ অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য সুফলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। তবে সমালোচকদের একাংশের মতে, এই বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলনামূলকভাবে আড়ালে রয়ে গেছে—ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় তথ্য সংযুক্তির মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যভাণ্ডারকে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক, ইউটিলিটি সেবা, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সমালোচকদের মতে, বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্রে সংরক্ষণ এবং বহু পক্ষের ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য নিরাপত্তা নিয়ে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাদের আশঙ্কা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় কোনো দুর্বলতা থাকলে প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাংক হিসাবের অর্থ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে আর্থিক সক্ষমতা বা সম্পদসংক্রান্ত তথ্য অসাধু চক্রের হাতে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হয়রানি কিংবা চাঁদাবাজির শিকার হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা ধরে রাখতে তথ্য সুরক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।
এতদিন কী ছিল নিয়ম:
বর্তমান ব্যবস্থায় জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন সনদ বা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব খোলা যায়। অন্যদিকে ব্যবসায়িক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিতে হয়। তবে ব্যাংক আমানতের সুদ বা মুনাফার ওপর উৎসে কর কাটার ক্ষেত্রে টিআইএন সনদের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। কোনো গ্রাহক টিআইএন সনদ জমা দিতে না পারলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মুনাফার ওপর অতিরিক্ত ৫ শতাংশ হারে আগাম কর কেটে রাখে।
সমালোচকদের মতে, এই অতিরিক্ত কর কর্তনের বিধান দীর্ঘদিন ধরেই কার্যকর রয়েছে। তাদের যুক্তি, কর ফাঁকি দেওয়া ব্যক্তি কিংবা বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের একটি অংশের জন্য এই অতিরিক্ত কর্তন খুব বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে ওঠেনি। ফলে শুধু অতিরিক্ত করের চাপ সৃষ্টি করে সবাইকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হবে—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অন্যদিকে, যারা অতিরিক্ত কর কর্তন এড়াতে আগ্রহী ছিলেন, তারা নিয়মিতভাবে টিআইএন সনদ ও কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রমাণপত্র ব্যাংকে জমা দিয়েছেন। ফলে বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়নের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা। প্রথম প্রশ্ন হলো, ব্যাংকগুলো কি ইতোমধ্যে তাদের তথ্যভাণ্ডারে টিআইএন ও ব্যাংক হিসাবের সংযোগ সম্পন্ন করেছে? সেই তথ্য কি বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এনবিআরের কাছে নিয়মিতভাবে পৌঁছাচ্ছে?
দ্বিতীয়ত, আগাম আয়কর হিসেবে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে কেটে রাখা অর্থ যথাযথভাবে সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত তদারকি ও যাচাই হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে সামনে এসেছে।
আরেকটি প্রশ্ন হলো, টিআইএন সনদ জমা দেওয়া গ্রাহক এবং সনদবিহীন গ্রাহকদের মধ্যে আচরণগত বা কর-অনুগত্যের কী ধরনের পার্থক্য রয়েছে, সে বিষয়ে এনবিআর কোনো তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ করেছে কি না। পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ধরনের বিশ্লেষণ থাকলে নতুন নীতি প্রণয়নের যৌক্তিকতা আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হতো।
তাদের দাবি, বিভিন্ন গবেষণা ও পরামর্শমূলক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে কিছু সাধারণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তার পক্ষে বিস্তারিত পরিসংখ্যান বা তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে বিদ্যমান তথ্যভাণ্ডার এবং পূর্ববর্তী নীতির ফলাফল নিয়ে আরও গভীর মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবের কার্যকারিতা মূল্যায়নের আগে ব্যাংক অ্যাকাউন্টধারীদের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য ও আচরণ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, স্বল্পমেয়াদি পরামর্শকের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর না করে তথ্য বিশ্লেষণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
তাদের মতে, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান (এমএফআই) ও মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) হিসাব বাদ দিয়ে কেবল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বিবেচনায় নিলে গ্রাহকদের কয়েকটি পৃথক শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। প্রথম শ্রেণীতে রয়েছেন এমন গ্রাহক, যাদের টিআইএন রয়েছে এবং তারা নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দেন। এই গোষ্ঠীকে তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ হিসেবে দেখা হয়। টিআইএনভিত্তিক পরিচয়ের মাধ্যমে তাদের তথ্য সহজেই যাচাই করার সুযোগ রয়েছে।
দ্বিতীয় শ্রেণীতে রয়েছেন যাদের টিআইএন আছে এবং তারা রিটার্নও জমা দেন, কিন্তু ব্যাংকে কর দাখিলের সনদ জমা দেন না। পর্যবেক্ষকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা ও প্রক্রিয়াগত ভোগান্তির কারণেই তারা এই আনুষ্ঠানিকতা এড়িয়ে চলেন। এ ধরনের হিসাবধারীদের ক্ষেত্রেও ব্যাংক লেনদেনের তথ্য ব্যবহার করে এনবিআরের যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে।
তৃতীয় শ্রেণীতে রয়েছে এমন একটি গোষ্ঠী, যাদের টিআইএন থাকলেও তারা নিয়মিত রিটার্ন জমা দেন না। ফলে তারা কার্যত করব্যবস্থার আওতায় থেকেও পূর্ণাঙ্গভাবে কর-অনুগত নন। ধারণা করা হয়, অন্য কোনো প্রশাসনিক বা আইনি প্রয়োজনের কারণে তারা একসময় টিআইএন গ্রহণ করেছিলেন। চতুর্থ শ্রেণীতে রয়েছেন যাদের ব্যাংক হিসাব রয়েছে, কিন্তু টিআইএন নেই। তারা করজালের বাইরে থাকলেও তাদের আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ বিশ্লেষণের সুযোগ বিদ্যমান। এর বাইরে এমন মানুষও আছেন, যাদের কোনো ব্যাংক হিসাবই নেই।
কাগজের সনদ জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা কতটা যৌক্তিক?
সমালোচকদের মতে, বিদ্যমান ব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা হলো কর দাখিলের সনদের কাগুজে কপি জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা। এর ফলে গ্রাহক ও ব্যাংক—উভয় পক্ষকেই অতিরিক্ত প্রশাসনিক ঝামেলা মোকাবিলা করতে হয়।
তারা উল্লেখ করেন, বর্তমানে অনেক গ্রাহকের সঙ্গে নির্দিষ্ট ব্যাংক শাখার সরাসরি যোগাযোগ আগের তুলনায় কমে গেছে। ফলে নথি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও হালনাগাদ করার দায়িত্বও অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্ব হারিয়েছে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাগজপত্র সংরক্ষণে বাড়তি ব্যয় সৃষ্টি হয়। আবার নিরীক্ষা কার্যক্রমের সময় এসব নথি ঘিরে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা বা হয়রানির আশঙ্কাও থেকে যায়। এ কারণেই কিছু ক্ষেত্রে গ্রাহকদের কর দাখিলের প্রমাণপত্র জমা দিতে উৎসাহিত করার বদলে নিরুৎসাহিত করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তারা।
পর্যবেক্ষকদের একটি অংশের মতে, এই সমস্যার প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান সম্ভব। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যেভাবে তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা হয়, একইভাবে ব্যাংকগুলোকে এনবিআরের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করে টিআইএন ও কর-সম্পর্কিত তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
তাদের প্রশ্ন, এমন ডিজিটাল যাচাই ব্যবস্থার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন এখনো কাগুজে সনদ জমা দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সমালোচকদের ভাষ্য, এটি হয়তো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও জবাবদিহি এড়ানোর প্রবণতার প্রতিফলন। আর সেই দায় শেষ পর্যন্ত ব্যাংক ও নিরীক্ষকদের ওপর গিয়ে পড়ে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে।
পুরোনো নীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন:
আরেকটি বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে টিআইএন সনদ না থাকলে ব্যাংক আমানতের মুনাফার ওপর অতিরিক্ত ৫ শতাংশ আগাম আয়কর কেটে রাখার বিধান চালু রয়েছে। এই নীতির কার্যকারিতা নিয়ে নানা মত থাকলেও তা এখনও বহাল রয়েছে এবং অনেকেই এটি অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন।
তবে সমালোচকদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, এই আগাম কর সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া কতটা কার্যকরভাবে তদারকি করা হচ্ছে। তাদের মতে, বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছ তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। কারণ নতুন কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপের আগে বিদ্যমান নীতির ফলাফল ও সীমাবদ্ধতা বোঝা জরুরি। ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব ঘিরে চলমান আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—কর প্রশাসনে কতটা প্রয়োজন সনদনির্ভরতা, আর কতটা সম্ভব তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
সমালোচকদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের প্রশাসনিক কাঠামোতেই সনদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। সাধারণত কোনো নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি পক্ষ নির্দেশ দেয়, অন্য একটি পক্ষ তা কার্যকর করে এবং সুবিধাভোগী বা করদাতারা সেই ব্যবস্থার আওতায় আসে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা বা ছাড় দিতে গেলে প্রমাণপত্রের প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই প্রক্রিয়ায় নতুন করে সনদদাতা, যাচাইকারী এবং নিরীক্ষকের মতো একাধিক স্তর যুক্ত হয়, যা পুরো ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তোলে। তাদের মতে, কর প্রশাসনে এই ধরনের বহুমাত্রিক কাঠামো অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যয় ও জটিলতা তৈরি করে। ফলে দায়িত্ব গ্রহণের পরিবর্তে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে দায়ভার স্থানান্তরের প্রবণতা দেখা যায়।
ছাড়প্রাপ্তির মানদণ্ড কতটা স্পষ্ট?
বাজেট প্রস্তাবে শিক্ষার্থী, কৃষক, মুক্তিযোদ্ধা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী এবং এনবিআরের অব্যাহতি পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক না করার কথা বলা হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, এসব শ্রেণির সংজ্ঞা ও বাস্তব অবস্থা সব সময় স্থির বা সহজে যাচাইযোগ্য নয়। তাদের যুক্তি, মুক্তিযোদ্ধার তালিকা বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। একইভাবে কৃষক পরিচয়ের আড়ালে করযোগ্য আয়সম্পন্ন ব্যক্তি থাকতে পারেন। আবার শিক্ষার্থী পরিচয়ও সব ক্ষেত্রে বয়স বা আর্থিক অবস্থার নির্ভরযোগ্য নির্দেশক নয়।
ফলে শুধু পরিচয়ভিত্তিক ছাড়ের ব্যবস্থা চালু করলে প্রকৃত সুবিধাভোগী ও করযোগ্য ব্যক্তিদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা কঠিন হতে পারে। এতে একদিকে প্রকৃত করদাতারা করজালের বাইরে থেকে যেতে পারেন, অন্যদিকে স্বচ্ছতা অর্জনের লক্ষ্যও পুরোপুরি বাস্তবায়িত নাও হতে পারে।
পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করেন, উন্নয়ন কর্মসূচিতে সাধারণত দৃশ্যমান ও সহজে যাচাইযোগ্য সূচকের ভিত্তিতে সহায়তা বা ছাড় প্রদান করা হয়। কিন্তু বাজেটে প্রস্তাবিত অনেক শ্রেণিভিত্তিক মানদণ্ড সরাসরি তথ্যের মাধ্যমে যাচাই করা কঠিন।
তাদের মতে, যদি ব্যাংক হিসাব ও টিআইএনের কার্যকর সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে ব্যক্তি পরিচয়ের পরিবর্তে আর্থিক লেনদেনের তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। উদাহরণ হিসেবে তারা বলেন, আমানত বা লেনদেনের একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হলে কে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য এবং কে নয়, তা তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ ও যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে। এ ধরনের তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হলে কর প্রশাসনে মানবিক হস্তক্ষেপ কমবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়বে বলে তাদের ধারণা।
তবে ব্যাংক হিসাব ও টিআইএনের সংযোগকে সমর্থন করলেও অনেকের প্রধান শর্ত হলো তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাদের মতে, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার জন্য তথ্য সংযুক্তি প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেই সঙ্গে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার শক্তিশালী নিশ্চয়তাও থাকতে হবে।
একই সঙ্গে তারা কাগুজে সনদ জমা দেওয়া, পুনঃযাচাই এবং প্রশাসনিক জটিলতার মতো দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি চান। তাদের প্রত্যাশা, এনবিআর সরাসরি তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করে নিজস্ব দায়িত্বে যাচাই কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে কর প্রশাসনকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও কার্যকর করে তুলবে।

