বাংলাদেশের কৃষি খাতে সারের সঠিক ব্যবহার এখন বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের অধিকাংশ কৃষক প্রয়োজনীয় ভারসাম্য বজায় না রেখে সার প্রয়োগ করছেন। এর ফলে একদিকে যেমন ফসলের সম্ভাব্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা ও কৃষির টেকসই উন্নয়নও হুমকির মুখে পড়ছে।
গত ১৫ জুন প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ কৃষক নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও সালফার নির্ধারিত অনুপাতে ব্যবহার করেন না। মাত্র ৫ শতাংশ কৃষক সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করেন, যা দেশের কৃষি ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ফসফরাস ব্যবহার করেন। অন্যদিকে অধিকাংশ কৃষক সালফারের ঘাটতি রেখে চাষাবাদ করেন। একইভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কৃষক পর্যাপ্ত পটাশিয়াম ব্যবহার করেন না। নাইট্রোজেনের ক্ষেত্রেও দেখা যায় ভিন্নধর্মী সমস্যা। ধান চাষে প্রয়োজনের চেয়ে কম নাইট্রোজেন ব্যবহার করা হলেও পেঁয়াজ ও সবজি উৎপাদনে অনেক ক্ষেত্রে এর অতিরিক্ত প্রয়োগ হচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই বৈষম্যের মাত্রাও এক নয়। বরিশাল ও সিলেট অঞ্চলে প্রয়োজনের তুলনায় কম সার ব্যবহারের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। বিপরীতে খুলনা ও রাজশাহী অঞ্চলে অতিরিক্ত সার প্রয়োগের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সারের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ করা গেলে বোরো ধানের ফলন প্রায় ৩৩ শতাংশ, আমন ধানের ফলন ৬৫ শতাংশ এবং আলুর উৎপাদন প্রায় ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বিশ্লেষকদের মতে, এই সমস্যার অন্যতম কারণ হলো কৃষকদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক কৃষি জ্ঞানের ঘাটতি। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত নির্দেশিকা তৈরি করলেও তা মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্তভাবে পৌঁছায় না। ফলে বহু কৃষক এখনও অভ্যাসগত বা প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে সার প্রয়োগ করছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ আরও জোরদার না হলে সুষম সার ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অসম মাত্রায় সার ব্যবহারের কারণে শুধু উৎপাদনশীলতা কমছে না, মাটির স্বাস্থ্যও দ্রুত অবনতি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অনেক এলাকার মাটি ক্রমশ অম্লীয় হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে কমে যাচ্ছে মাটির পানি ধারণক্ষমতা ও প্রাকৃতিক উর্বরতা। ফলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাটির গড় পিএইচ মাত্রা এখন প্রায় ৪ দশমিক ৫, যা কাঙ্ক্ষিত মাত্রার তুলনায় অনেক কম। মাটির গুণগত মান উন্নত করতে সাধারণত ৬ দশমিক ৫ বা তার বেশি পিএইচ প্রয়োজন হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক উপকরণের অতিরিক্ত ব্যবহার মাটির এই অম্লতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, একই জমিতে বারবার ও নিবিড়ভাবে ফসল উৎপাদনের ফলে মাটির জৈব উপাদানও আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। অনেক জমিতে বছরে তিন থেকে চারবার পর্যন্ত ফসল আবাদ করা হচ্ছে। ফলে মাটি পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাচ্ছে না এবং প্রাকৃতিকভাবে পুষ্টি পুনরুদ্ধারের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আদর্শ অবস্থায় মাটিতে প্রায় ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষিজমিতে এর পরিমাণ ১ শতাংশেরও নিচে। কোথাও কোথাও তা মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে। টেকসই উৎপাদন বজায় রাখতে অন্তত ২ শতাংশ জৈব পদার্থ প্রয়োজন বলে মনে করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে বিদ্যমান জমি, শ্রম ও কৃষি উপকরণের আরও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের উৎপাদন গড়ে প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এজন্য শুধু সার ব্যবহারের নিয়ম প্রচার নয়, বরং অঞ্চলভিত্তিক ও জমিভিত্তিক সুপারিশ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সব জমির মাটির বৈশিষ্ট্য এক নয়। তাই এক ধরনের সুপারিশ দিয়ে সব অঞ্চলের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। উন্নত কৃষি ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি জমির মাটির পুষ্টিগত অবস্থা মূল্যায়ন করে পৃথক নির্দেশনা দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে সেই ধরনের তথ্যভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনা চালুর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, আধুনিক মাটি পরীক্ষা ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহ এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর পরামর্শ সেবা জোরদার করা গেলে সারের অপব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। এতে উৎপাদন খরচ কমবে, ফলন বাড়বে এবং দেশের কৃষি আরও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।

