দেশের ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশকে ৪৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। ব্যাংকিং খাতে চলমান সংস্কার কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়া, আমানতকারীদের সুরক্ষা জোরদার করা এবং নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই অর্থায়ন অনুমোদন করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক পর্ষদ সম্প্রতি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই অর্থায়নের অনুমোদন দেয়। ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ নামের প্রকল্পের আওতায় অর্থ ছাড় করা হবে। প্রকল্পটি মূলত ব্যাংক খাতে আস্থা পুনর্গঠন, ক্ষুদ্র আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেবে।
বিশ্বব্যাংক মনে করছে, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা অপরিহার্য। কিন্তু দীর্ঘদিনের দুর্বল সুশাসন, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং প্রভাবশালী গ্রাহকদের ঋণ সুবিধা পাওয়ার সংস্কৃতির কারণে ব্যাংক খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। যা দক্ষিণ এশিয়ার গড় খেলাপি ঋণের হারের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর মূলধন সক্ষমতার অবস্থাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে ঝুঁকি-সমন্বিত সম্পদের বিপরীতে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূলধন অনুপাত ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে।
নতুন প্রকল্পের আওতায় আমানত সুরক্ষা তহবিলকে আরও শক্তিশালী করা হবে, যাতে কোনো ব্যাংক সংকটে পড়লেও ক্ষুদ্র আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা যায়। পাশাপাশি জরুরি তারল্য সহায়তার একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা হবে, যা সংকটকালীন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোকে সাময়িক সহায়তা দিতে সক্ষম হবে।
এ ছাড়া সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক পুনর্গঠন ও সমাধানের জন্য একটি আধুনিক কৌশল প্রণয়ন করা হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কার কার্যক্রমেও সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বাস্থ্য ও পরিচালন দক্ষতা উন্নত করা যায়।
বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আগামী দিনে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে হলে ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। কারণ দেশের মোট আর্থিক খাতের সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশই ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে ব্যাংক খাত দুর্বল হলে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে।
প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো আধুনিকায়ন করা হবে। সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, তথ্য বিশ্লেষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থার উন্নয়নে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে ব্যাংক খাতে শুধু মূলধন সংকট নয়, প্রযুক্তিগত ঝুঁকিও দ্রুত বাড়ছে। তাই উন্নত তথ্যভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে অনিয়ম, ঝুঁকি ও সম্ভাব্য সংকট আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের চলমান সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। এর মাধ্যমে ব্যাংক খাতের চাপ মোকাবিলা, সংকট ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকারের সক্ষমতা বাড়বে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন এই অর্থায়ন শুধু ঋণ সহায়তা নয়; বরং বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে প্রকৃত সুফল পেতে হলে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার মতো সংস্কার কার্যক্রমও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে।
তাদের মতে, সংস্কার উদ্যোগ সফল হলে ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরবে, আমানতকারীদের নিরাপত্তা বাড়বে এবং বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য একটি শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি তৈরি হবে। আর সেটিই আগামী দিনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

