ব্যাংক শাখাগুলোতে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বন্ধ রয়েছে—এমন অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আকস্মিক পরিদর্শনের প্রথম দিনে কিছু সীমিত প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত সমস্যা ধরা পড়লেও কোনো ব্যাংক ইচ্ছাকৃতভাবে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বন্ধ রেখেছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, গ্রাহকদের সেবা নিশ্চিত করতে পরিদর্শন কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা হবে এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক শাখায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি না করার অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরই ধারাবাহিকতায় একাধিক পরিদর্শক দল গঠন করে ২৮ ও ২৯ জুন দেশের বিভিন্ন ব্যাংক শাখায় পরিচয় গোপন রেখে সরেজমিন পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে সব ব্যাংককে সঞ্চয়পত্র বিক্রির সেবা চালু রাখার নির্দেশনা দিয়ে গত ২৪ জুন একটি সার্কুলারও জারি করা হয়। ওই নির্দেশনায় গ্রাহকদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা অনুমোদিত ব্যাংকগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক সেবা। সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংক এ সেবা দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে—এমন অভিযোগ পাওয়ার পর বাস্তব চিত্র জানতে সরাসরি পরিদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পরিদর্শনের প্রথম দিনে একটি নতুন প্রজন্মের ব্যাংকের শাখায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি না করার তথ্য পাওয়া যায়। তবে পরে তদন্তে জানা যায়, জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রির জন্য প্রয়োজনীয় অনলাইন আইডি এখনো না পাওয়ায় ওই ব্যাংক সেবা চালু করতে পারেনি। ব্যাংকটি অনেক আগেই আবেদন করলেও প্রযুক্তিগত অনুমোদন না পাওয়ায় কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া রাজধানীর বাইরে রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংক শাখায় সাময়িক সার্ভার সমস্যার কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বন্ধ ছিল। তবে এটি ছিল প্রযুক্তিগত জটিলতা, নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়। এসব ছাড়া বড় ধরনের কোনো অনিয়ম বা ইচ্ছাকৃতভাবে সেবা বন্ধ রাখার ঘটনা পরিদর্শনে ধরা পড়েনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট ২১টি ব্যাংক বিভিন্ন কারণে সঞ্চয়পত্র সংক্রান্ত সেবা দিচ্ছে না। এর মধ্যে ৯টি বিদেশি মালিকানাধীন ব্যাংক, যেগুলো এই সেবা পরিচালনা করে না। বাকি ১২টি ব্যাংক আর্থিক সংকটের কারণে কার্যত সীমিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয়পত্র সংক্রান্ত লেনদেনও সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা, এসব ব্যাংকে গিয়ে সেবা না পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই অনেক গ্রাহক সাধারণভাবে অভিযোগ করেছেন যে ব্যাংকগুলো সঞ্চয়পত্র বিক্রি করছে না।
বর্তমানে অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র এবং পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র—এই চার ধরনের সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা হয়। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের কার্যালয়ের পাশাপাশি দেশের অনুমোদিত ব্যাংক শাখা ও ডাকঘর থেকেও এসব সঞ্চয়পত্র কেনা এবং নগদায়ন করা যায়।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে নতুন সঞ্চয়পত্র বিক্রির তুলনায় পুরোনো সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর প্রবণতা বেশি থাকায় সরকার এ খাত থেকে নিট ঋণ পাচ্ছে না। বরং সরকারের পরিশোধের পরিমাণ নতুন বিনিয়োগের চেয়ে বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে একসময় সরকারের অন্যতম বড় অভ্যন্তরীণ ঋণের উৎস হিসেবে বিবেচিত সঞ্চয়পত্র খাত এখন উল্টো অর্থ পরিশোধের চাপ তৈরি করছে।
তার পরও প্রতি অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ঋণ সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ খাত থেকে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ সংগ্রহের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ ২ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা কমেছে।
এর আগের কয়েক অর্থবছরেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারের নিট ঋণ কমেছিল ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। তার আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ১২৪ কোটি টাকা এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে কমেছিল ৩ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। ফলে চলতি বছরের মার্চ শেষে সঞ্চয়পত্র খাতে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পেছনে কঠোর যাচাই-বাছাই, অনলাইন নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হওয়া, বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকিং সেবার প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ভূমিকা রাখছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিদর্শন প্রমাণ করেছে, সব ব্যাংক ইচ্ছাকৃতভাবে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বন্ধ রেখেছে—এমন ধারণা সঠিক নয়। প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা দ্রুত দূর করা গেলে গ্রাহকসেবা আরও সহজ ও কার্যকর হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

