দেশের ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট নতুন মাত্রা পেয়েছে। মূলধনে শক্তিশালী ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন সীমিত করে দিচ্ছে। আন্তঃব্যাংক ঋণ, মানি মার্কেট লেনদেন, এটিএম নেটওয়ার্ক এবং বিভিন্ন ধরনের পেমেন্ট ব্যবস্থায় ঝুঁকি এড়াতে তারা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এর ফলে শুধু ব্যাংকগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কই দুর্বল হচ্ছে না, এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাধারণ গ্রাহকদের ওপরও।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও শীর্ষ ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট এবং আর্থিক দুর্বলতার কারণে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের প্রতি বাজারের আস্থা কমে গেছে। নিজেদের আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় শক্তিশালী ব্যাংকগুলো এখন দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে নতুন ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী।
এরই মধ্যে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের গ্রাহক অন্য ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে একটি বড় ইসলামী ধারার ব্যাংককে ঘিরে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ওই ব্যাংকের গ্রাহকদের ব্যাপক নগদ উত্তোলনের চাপ, নতুন নোটের সংকট এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সীমিত নগদ সরবরাহের কারণে পুরো ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে কিছু শক্তিশালী ব্যাংক নিজেদের এটিএম নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত চাপ এড়াতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয় বলে ব্যাংক খাতের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
তবে একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দুর্বল ব্যাংকের এটিএম থেকে টাকা না পেলে গ্রাহকরা শক্তিশালী ব্যাংকের বুথ ব্যবহার করেন। এতে নগদ সরবরাহ ও নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। তাই কিছু ব্যাংক ঝুঁকি মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
অন্যদিকে একটি বড় বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাদের এটিএমে অন্য ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য কোনো বৈষম্য করা হয় না। নির্ধারিত সীমার মধ্যে সব গ্রাহকই টাকা তুলতে পারেন।
ব্যাংকারদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মূলত ব্যাংকগুলোর পারস্পরিক আস্থার অবনতির প্রতিফলন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, একটি ব্যাংক যদি অন্য ব্যাংকের ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড গ্রহণে অনীহা দেখায়, তাহলে সেটি পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক সংকেত। তাঁর মতে, এটি অর্থনৈতিক নয়, বরং দীর্ঘদিনের নীতিগত ও ব্যবস্থাপনাগত সমস্যার ফল।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাশরুর আরেফিন বলেন, যেসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি রয়েছে, সেখানে আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকিতে ফেলে অন্য ব্যাংকের অর্থ বিনিয়োগ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ভালো ব্যাংক বরাবরই ভালো ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যা নতুন নয়; অনেক বছর ধরেই এসব দুর্বলতা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এত বেশি ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। তাঁর মতে, ১২ থেকে ১৫টি শক্তিশালী ব্যাংক দিয়েই দেশের ব্যাংকিং চাহিদার বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতের মাত্র ২৬টি ব্যাংক ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫ শতাংশ মূলধন পর্যাপ্ততার শর্ত পূরণ করতে পেরেছে। অন্যদিকে পুরো ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকিভিত্তিক মূলধন অনুপাত নেমে গেছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে।
তুলনামূলকভাবে একই সময়ে ভারতে এ হার ছিল ১৭ দশমিক ২ শতাংশ, পাকিস্তানে ২০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে ২০টি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকায়। এই পরিস্থিতিতে শক্তিশালী ব্যাংকগুলো আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ঝুঁকি নতুন করে মূল্যায়ন করছে।
একজন জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার বলেন, এটিএম থেকে টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রেও একটি ব্যাংককে প্রথমে নিজের অর্থ ব্যবহার করতে হয়, পরে কার্ডধারীর ব্যাংক থেকে সেই অর্থ সমন্বয় হয়। কিন্তু আর্থিকভাবে দুর্বল কোনো ব্যাংক যদি সময়মতো অর্থ পরিশোধ করতে না পারে, তাহলে সেটি ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ব্যাংকাররা বলছেন, শুধু এটিএম নয়, পে-অর্ডার, ব্যাংক ড্রাফট ও অন্যান্য পেমেন্ট ইন্সট্রুমেন্ট নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। আগে কোনো ব্যাংকের পে-অর্ডার প্রায় শতভাগ নিরাপদ বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু বর্তমানে কিছু দুর্বল ব্যাংকের ক্ষেত্রে সেই আস্থা আগের মতো নেই।
একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, যদি কোনো শক্তিশালী ব্যাংকের পে-অর্ডার হাতে আসে, তাহলে সেটিকে সহজেই গ্রহণ করা যায়। কিন্তু আর্থিক সংকটে থাকা কিছু ব্যাংকের ক্ষেত্রে একই ধরনের আস্থা তৈরি হয় না। ফলে বাণিজ্যিক লেনদেনেও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, একটি তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান যদি দুর্বল কোনো ব্যাংকের গ্রাহক হয়, তাহলে সরবরাহকারীকে অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এতে ব্যবসায়িক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকগুলোর প্রকাশিত খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকৃত পরিস্থিতির পুরো চিত্র তুলে ধরে না। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও বৈদেশিক ঋণদাতারা খেলাপি ঋণের পাশাপাশি পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং দীর্ঘদিনের বকেয়া ঋণকেও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে।
ফলে কোনো ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪ শতাংশ খেলাপি ঋণ দেখালেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রকৃত ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতে পারে।
এদিকে অনেক দুর্বল ব্যাংক উচ্চ সুদের প্রলোভন দেখিয়ে নতুন আমানত সংগ্রহের চেষ্টা করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি স্বল্পমেয়াদে তারল্য সংকট কিছুটা কমালেও দীর্ঘমেয়াদে আমানতকারীদের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ব্যাংকারদের মতে, কেবল মূলধন জোগান দিয়ে দুর্বল ব্যাংককে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। এর পাশাপাশি প্রয়োজন সুশাসন, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং পরিচালনা ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার।
তাদের মতে, উন্নত দেশগুলোতে কোনো ব্যাংককে উদ্ধার করতে হলে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি কঠোর তদারকি, পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সংস্কার বাধ্যতামূলক করা হয়। বাংলাদেশেও একই ধরনের সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করা কঠিন হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা সাময়িক চাপ কমাতে সাহায্য করলেও মূল সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক পুনর্গঠন, মূলধন শক্তিশালী করা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং কার্যকর সুশাসন প্রতিষ্ঠা। অন্যথায় ব্যাংকগুলোর মধ্যে আস্থার এই সংকট ভবিষ্যতে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য আরও বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

