দেশে কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও একই সঙ্গে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৯৩ শতাংশ, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগের মে মাসের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মে মাস শেষে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ২০ হাজার ১৩০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন ঋণ শ্রেণীকরণ নীতিমালা কার্যকর হওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ হঠাৎ বেড়েছে।
সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক—বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে। এই দুই প্রতিষ্ঠানে কৃষি খাতের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৬৫ শতাংশ রয়েছে। গত বছরের মে মাসে এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ছিল ২ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা, যা এক বছরে ৩৯৩ শতাংশ বেড়ে ১৩ হাজার ১৮৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কৃষি খাতের খেলাপি ঋণও ৬৬ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা হয়েছে। একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর কৃষি খাতের খেলাপি ঋণ ১৬৪ শতাংশ বেড়ে ৯৩৯ কোটি টাকা এবং অন্যান্য বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১৪ শতাংশ বেড়ে ৮৬০ কোটি টাকা হয়েছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোর কৃষি খাতে কোনো খেলাপি ঋণ নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৪ সালের নভেম্বরে জারি করা নতুন ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিং নীতিমালার কারণে ঋণ পরিশোধে সময়সীমা কঠোর করা হয়েছে। কিস্তি বা ঋণের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরদিন থেকেই ঋণকে বকেয়া হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। ফলে আগে নিয়মিত হিসেবে থাকা অনেক ঋণ নতুন করে খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ হয়েছে।
অন্যদিকে কৃষিঋণ বিতরণেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরে ৩৯ হাজার কোটি টাকা কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মে মাস পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ৩৮ হাজার ৭৭ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৯৮ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) আরও ১ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা বিতরণ করায় মোট কৃষিঋণ বিতরণ দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে ঋণ শ্রেণীকরণ ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরলেও কৃষি খাতে খেলাপি ঋণের এই ঊর্ধ্বগতি ভবিষ্যতে ঋণপ্রবাহ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি কৃষকদের জন্য টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনা জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

