বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণের চাপ কমাতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই উদ্যোগের আওতায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে খেলাপি ঋণগ্রহীতারা ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে এককালীন পুরো বকেয়া অর্থ পরিশোধ করে ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ পাবেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, এ ব্যবস্থার ফলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ঋণের একটি অংশ আদায় সম্ভব হবে, ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে এবং উৎপাদনমুখী খাতে নতুন ঋণ বিতরণের পথ আরও সহজ হবে।
সোমবার জারি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সার্কুলারে এই বিশেষ সুবিধার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত যেসব ঋণ ‘মন্দ’ বা ‘ক্ষতিজনক’ শ্রেণিতে রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এই সুবিধা প্রযোজ্য হতে পারে। তবে কোনো ঋণগ্রহীতাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ সুযোগ দেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে মূল্যায়ন করবে এবং পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
দেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার ৩২ শতাংশেরও বেশি বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উল্লেখ করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এত বড় পরিমাণ খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করে তুলছে। একই সঙ্গে নতুন উদ্যোক্তা ও শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে অর্থনীতিতে বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে উৎপাদন, শিল্প ও কর্মসংস্থানমুখী খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো জরুরি। কিন্তু বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনা, সম্পদের মান এবং ঋণ বিতরণ সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ বাস্তবতায় আটকে থাকা ঋণের একটি অংশ দ্রুত পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যেই এই বিশেষ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, এক্সিট সুবিধা নিতে আগ্রহী ঋণগ্রহীতাকে এককালীন পুরো বকেয়া অর্থ পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ কিস্তিতে পরিশোধ বা আংশিক অর্থ দিয়ে এই সুবিধা পাওয়া যাবে না। ব্যাংক সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের আর্থিক অবস্থা, ঋণের ইতিহাস, পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।
সুদ মওকুফের বিষয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিদ্যমান নীতিমালা বহাল রেখেছে। অর্থাৎ কোনো ঋণের সুদ কমানো বা মওকুফ করতে হলে প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। নতুন সার্কুলারের মাধ্যমে সুদ ছাড়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়নি।
তবে সব ধরনের খেলাপি ঋণ এই ব্যবস্থার আওতায় আসছে না। ৬ আগস্ট ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৬ সময়ের মধ্যে যেসব ঋণ সম্পূর্ণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে, সেগুলো এই সুবিধার বাইরে থাকবে। পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ এবং কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতের ঋণও এই বিশেষ উদ্যোগের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এসব খাতের জন্য আলাদা নীতিমালা কার্যকর রয়েছে এবং তাদের বিশেষ গুরুত্ব বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে ঋণগ্রহীতাদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি বিস্তারিতভাবে যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা অযৌক্তিক সুবিধা যেন না দেওয়া হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতা, ঋণের প্রকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট সব তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় তদন্ত সম্পন্ন করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বহু বছর ধরে আদালত, আইনি জটিলতা কিংবা আর্থিক সংকটের কারণে আটকে থাকা কিছু ঋণ এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আদায় হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতে ব্যাংকগুলো নগদ অর্থ ফেরত পাবে এবং দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর হয়ে থাকা সম্পদের একটি অংশ আবারও আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্ত হবে। এর ফলে ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, এই ধরনের সুবিধা কার্যকর করতে হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত অর্থে আদায়যোগ্য ঋণ পুনরুদ্ধারই যদি মূল লক্ষ্য হয়, তাহলে প্রতিটি আবেদন কঠোরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। অন্যথায় নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীদের মধ্যে বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হতে পারে এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধে অনীহাও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণ কমানো শুধু একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিষয় নয়; এর সঙ্গে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, ঋণ অনুমোদনের মান, তদারকি ব্যবস্থা এবং আইনি কাঠামোর কার্যকারিতাও সরাসরি জড়িত। তাই এককালীন নিষ্পত্তির সুযোগের পাশাপাশি ঋণ বিতরণ ও পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারও সমানভাবে প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই বিশেষ এক্সিট সুবিধা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এ সময়ের মধ্যে ব্যাংকগুলোকে যোগ্য ঋণগ্রহীতাদের বিষয়টি জানিয়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, এ উদ্যোগের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের চাপ কিছুটা কমবে, ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে এবং উৎপাদন ও বিনিয়োগমুখী খাতে নতুন অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে।

