দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা আরও ভারী হয়েছে। গত জুন মাস শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রথমবারের মতো ৬ লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানেই এই পরিমাণ বেড়েছে প্রায় সাড়ে সতেরো হাজার কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আজ বুধবার প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় পাঁচ লাখ আটাশি হাজার কোটি টাকা, জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ছয় লাখ ছয় হাজার কোটি টাকায়। এই অঙ্ক মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় সাড়ে বত্রিশ শতাংশ, যা ব্যাংক খাতের জন্য একটি উদ্বেগজনক অনুপাত।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন মুখপাত্র জানান, মূলত বকেয়া ঋণের সঙ্গে সুদ যুক্ত হওয়ার কারণেই খেলাপির পরিমাণ বেড়েছে। তবে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে ইতিমধ্যে ঋণ পুনঃতফসিলের বিশেষ সুযোগ চালু করা হয়েছে, যার সুফল আগামী দিনগুলোতে দেখা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় পাঁচ লাখ সাতান্ন হাজার কোটি টাকা, যা মার্চে গিয়ে বেড়েছিল প্রায় একত্রিশ হাজার কোটি টাকা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও পরের প্রান্তিকগুলোতে তা আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে যায়।
আরেকটি লক্ষণীয় তথ্য হলো, সম্প্রতি একীভূত হয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অন্তর্ভুক্ত পাঁচটি ব্যাংকেই খেলাপি ঋণের হার ৮০ শতাংশের বেশি, যা সামগ্রিক খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে।
ব্যাংকাররা মনে করছেন, দীর্ঘ প্রায় সাড়ে পনেরো বছরের সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে ব্যাপক অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতির প্রভাবেই মূলত খেলাপি ঋণ এই পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ওই সরকার ক্ষমতায় আসার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র প্রায় সাড়ে বাইশ হাজার কোটি টাকা, যা তাদের শাসনামলের শেষদিকে অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুনে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় দুই লাখ এগারো হাজার কোটি টাকায়।
ওই সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ব্যাংক খাতের প্রকৃত আর্থিক চিত্র প্রকাশ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় পূর্ববর্তী সরকার-ঘনিষ্ঠ অনেক ঋণগ্রহীতাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি, যার ফলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ চালু করে, যার ফলে সাময়িকভাবে খেলাপি ঋণের প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা লাগাম টানা সম্ভব হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি এবং খেলাপি ঋণ আবারও ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরেছে।

