ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬–এর সবচেয়ে আলোচিত ধারা ১৮(ক) বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটের সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বিভিন্ন অংশীজনের মতামত ও আপত্তি বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও জনগণের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার এবং সংস্কার কার্যক্রমকে আরও গ্রহণযোগ্য করতে আইনটির বিতর্কিত বিধানটি বাতিল করা হচ্ছে। তার ভাষায়, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং অতীতে যারা ব্যাংক খাতের ক্ষতির জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
ব্যাংক রেজল্যুশন আইনটি চলতি বছরের ১০ এপ্রিল সংসদে পাস হওয়ার আগে এতে ১৮(ক) নামে একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়। ওই বিধানে বলা হয়েছিল, কোনো ব্যাংক রেজল্যুশন বা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় যাওয়ার আগে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ব্যাংকটির শেয়ারধারী ছিলেন, তারা ভবিষ্যতে আবারও সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ কিংবা দায়ভার গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করতে পারবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলে অন্য কোনো যোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকেও একই সুযোগ দিতে পারবে।
এই বিধান যুক্ত হওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গন, অর্থনীতিবিদ, ব্যাংক বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, বিতর্কিত বা অনিয়মের অভিযোগে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হারানো কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর জন্য ভবিষ্যতে আবারও মালিকানা ফিরে পাওয়ার পথ তৈরি করা হয়েছে। সংসদেও বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে এ ধারা নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলা হয়।
সরকার এখন সেই বিতর্কের অবসান ঘটাতে আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিতর্কিত বিধান বাতিল হলে ব্যাংক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হবে এবং জনগণের মধ্যে ব্যাংকিং খাত নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই দূর হতে পারে।
অর্থমন্ত্রী সংসদে একীভূত হওয়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, ব্যক্তিগত আমানতকারীরা চলতি হিসাব ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করতে পারবেন। বাকি অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হবে। এছাড়া ক্যানসার রোগী, কিডনি ডায়ালাইসিসে থাকা রোগী, হজের জন্য সঞ্চয়কারী এবং ডিপিএস গ্রাহকদের জন্য বিশেষ মানবিক সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার একাধিক কর-সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে। অর্থমন্ত্রীর ঘোষণায় বলা হয়েছে, জিরো কুপন বন্ড থেকে অর্জিত আয় করমুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য কর-রেয়াত, ব্যাংকিং চ্যানেলে সব ধরনের লেনদেন সম্পন্নকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য অতিরিক্ত কর সুবিধা এবং লভ্যাংশের ওপর করহার কমানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ ছাড়া মিউচুয়াল ফান্ডে কর সুবিধা পেতে বর্তমানে যে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের সীমা রয়েছে, সেটিও তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের আশা, এসব পদক্ষেপের ফলে দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে এবং বাজার আরও সক্রিয় হবে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, অর্থপাচার ও আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকারভিত্তিক মামলায় দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে ১৩টি দেশে ২৩টি পারস্পরিক আইনি সহায়তার আবেদন পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বড় ঋণখেলাপি ছয়টি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রথম ধাপে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার ধীরে ধীরে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগোতে চায়। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ছয় হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে উন্নয়ন ব্যয়ে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।
তিনি আরও জানান, ব্যবসা সহজ করতে বিভিন্ন খাতে নিয়ন্ত্রক জটিলতা কমানো, প্রায় ৬০টি পণ্যের উৎসে কর হ্রাস, সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকর করা এবং বাজারে কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সরকার শুধু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচনা করছে।

