নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পথে চূড়ান্ত প্রশাসনিক বাধাও দূর হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) আবেদুর রহমান সিকদারকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দেওয়ায় নতুন ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহী হিসেবে তার দায়িত্ব গ্রহণ এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন। নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পর পাঁচটি সংকটাপন্ন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পুনর্গঠন কার্যক্রম আরও গতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এর আগে গত ২৩ জুন অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে আবেদুর রহমান সিকদারকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। পরে নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনাপত্তিপত্র চাওয়া হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোমবার সেই অনুমোদন দেয়।
ব্যাংকটির চেয়ারম্যান কাজী শায়রুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়ার পর এখন দায়িত্ব গ্রহণের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে খুব শিগগিরই নতুন এমডি দায়িত্ব পালন শুরু করবেন।
অন্যদিকে আবেদুর রহমান সিকদারও জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর দ্রুত নতুন দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন পূর্ণকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক না থাকায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে পাঁচটি ব্যাংকের সম্পদ ও দায় একীভূত করা, প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন, প্রযুক্তিগত সমন্বয় এবং গ্রাহকসেবা স্বাভাবিক করার মতো বড় কাজগুলো দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার জন্য শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল।
একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো হলো এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট কাটিয়ে একটি কার্যকর ব্যাংকিং কাঠামো গড়ে তোলাই নতুন ব্যবস্থাপনার প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এমডির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ দীর্ঘদিন ধরে অনেক গ্রাহক সময়মতো অর্থ উত্তোলন করতে না পারায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি বড় অঙ্কের লেনদেন অনুমোদন, পুনর্গঠন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং তারল্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করাও নতুন নেতৃত্বের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে।
এ ছাড়া পাঁচটি ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, কোর ব্যাংকিং সিস্টেম, জনবল, শাখা ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমকে একটি অভিন্ন কাঠামোয় আনা এখন সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক কাজগুলোর একটি। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, পূর্ণকালীন প্রধান নির্বাহী দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব কার্যক্রমের বাস্তবায়ন দ্রুত এগোবে।
ব্যাংক খাতের চলমান সংকট মোকাবিলায় সরকার আর্থিকভাবে দুর্বল পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের সম্পদ ও দায় একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা, ব্যাংকিং সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ‘ব্যাংক রেজল্যুশন স্কিম, ২০২৫’-এর আওতায় পাঁচটি ব্যাংকের সম্পদ ও দায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’-এর অধীনে গ্রাহকদের প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে বাকি অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
সরকার ইতোমধ্যে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছে। পাশাপাশি সুশাসন জোরদার করতে কোম্পানি সেক্রেটারি, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা এবং প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আবেদুর রহমান সিকদারের দায়িত্ব গ্রহণ শুধু একটি প্রশাসনিক নিয়োগ নয়; এটি ব্যাংকটির পুনর্গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। তার নেতৃত্বে পুনর্গঠন কার্যক্রম, তারল্য ব্যবস্থাপনা, গ্রাহকদের আমানত ফেরত এবং স্বাভাবিক ব্যাংকিং সেবা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজ আরও গতিশীল হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।
বর্তমানে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। এর মধ্যে সরকারের অংশীদারিত্ব রয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা এবং অবশিষ্ট ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের জমার বিপরীতে শেয়ারে রূপান্তর করা হয়েছে। গত বছরের ৩০ নভেম্বর নতুন ব্যাংকটির কার্যক্রম পরিচালনার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়।

