ব্যাংকগুলো যাতে আমানতের সুদের তুলনায় ঋণের সুদ অস্বাভাবিকভাবে বাড়াতে না পারে, সে জন্য নতুন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা ঋণ ছাড়া অন্য সব ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে আমানত ও ঋণের গড় সুদহারের ব্যবধান বা ইন্টারমিডিয়েশন স্প্রেড সর্বোচ্চ ৪ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ঋণগ্রহীতাদের ওপর অতিরিক্ত সুদের চাপ কমবে এবং উৎপাদন ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়েছে। নির্দেশনা জারির সঙ্গে সঙ্গেই তা কার্যকর হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে অনেক ব্যাংক আমানতের সুদ তুলনামূলক কম বাড়ালেও ঋণের সুদহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে। ফলে আমানত ও ঋণের গড় সুদহারের ব্যবধান দ্রুত বেড়ে যায়। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে শিল্প, উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগে, কারণ উদ্যোক্তাদের ঋণ নেওয়ার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অনেক ব্যাংক গড়ে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করলেও একই অর্থ ১২ শতাংশ বা তারও বেশি সুদে ঋণ হিসেবে বিতরণ করছে। ফলে গড় সুদ ব্যবধান সাড়ে ৫ শতাংশের বেশি দাঁড়িয়েছে। কিছু ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান ৮ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক।
এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই নতুন সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন থেকে ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা ঋণ ব্যতীত সব ধরনের ঋণে ব্যাংকগুলোকে গড়ভারিত সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে। অর্থাৎ আমানতের সুদের তুলনায় ঋণের সুদ নির্ধারণে ব্যাংকগুলো আর ইচ্ছেমতো বড় ব্যবধান রাখতে পারবে না।
সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দেওয়া ক্ষমতাবলে এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, ২০২৩ সালের নভেম্বরে রেফারেন্স রেট ও মার্জিনভিত্তিক ঋণের সুদহার ব্যবস্থা চালুর সময় স্প্রেড-সংক্রান্ত আগের নির্দেশনাগুলো প্রত্যাহার করা হয়েছিল। পরে ২০২৪ সালের মে মাসে পুরোপুরি বাজারভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থা কার্যকর হলেও স্প্রেডের কোনো সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। সেই সুযোগে কয়েকটি ব্যাংক ঋণের সুদ দ্রুত বাড়িয়ে ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই নীতি ঋণের সুদহার নিয়ন্ত্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি কতটা শক্তিশালী হয় তার ওপর। যদি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে ব্যাংকগুলোর মধ্যে অস্বাভাবিক সুদহার নির্ধারণের প্রবণতা কমতে পারে।
তাদের মতে, উৎপাদনমুখী শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং রপ্তানিমুখী ব্যবসার জন্য ঋণের ব্যয় কমানো বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুদের ব্যবধান সীমিত হলে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হওয়ার পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তারা তুলনামূলক কম ব্যয়ে অর্থায়নের সুযোগ পেতে পারেন।
অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ, বাজারভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থা চালুর উদ্দেশ্য ছিল প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ভারসাম্য সৃষ্টি করা। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ঋণের সুদ দ্রুত বাড়ালেও আমানতকারীদের একই হারে সুবিধা দেয়নি। নতুন স্প্রেডসীমা সেই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়নের ফলে ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক চাপ কমবে, উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর সুদহার নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অধিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে বলেও তারা আশা করছেন।

