কঠোর মুদ্রানীতির ইতিবাচক প্রভাব আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়নে, নীতিগত সুদের হার উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখার ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ ধীরে ধীরে কমছে। তবে একই সঙ্গে দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধীরগতি দেশের অর্থনীতির জন্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করার আগে প্রকাশিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মুদ্রানীতি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিকেল ৩টায় নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা, নীতিগত সুদের হার বা পলিসি রেট আগের মতোই ১০ শতাংশ রাখা হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে পলিসি রেট ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। এর আগে ২০২২ সালের মে থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ১১ দফা সুদের হার বাড়ানো হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এই কঠোর অবস্থান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
প্রতিবেদনে গভর্নর মোহাম্মদ মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থার উন্নতির কারণেও বাজারে মূল্যচাপ কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে আসে, যা এক বছর আগে ছিল ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। তবে এই হার এখনো বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে অবস্থান করছে।
তবে সাম্প্রতিক তথ্য কিছুটা ভিন্ন চিত্রও তুলে ধরেছে। গভর্নরের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এক বছর আগে একই সময়ে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কমানোর পথে অগ্রগতি হলেও তা এখনো পুরোপুরি স্থায়ী হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখিয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, পারস্পরিক শুল্ক আরোপ এবং বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির প্রসঙ্গ তুলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় ভালো ছিল। এর পেছনে বড় অর্থনীতিগুলোর আর্থিক প্রণোদনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্থিতিশীলতা, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে আগামী সময়ের জন্য বেশ কয়েকটি ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সীমিত করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকেও বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশঙ্কা, এসব কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বিনিময় হার নিয়ে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। এতে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও বাড়তে পারে।
তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশ ব্যাংক আশাবাদী। তাদের মতে, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, উৎপাদনমুখী খাতে ধারাবাহিক সহায়তা এবং ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি অভ্যন্তরীণ চাহিদা, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং রপ্তানি কার্যক্রমকে উৎসাহিত করবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে। প্রয়োজন হলে সময়োপযোগী নীতিগত পদক্ষেপও নেওয়া হবে।
গভর্নরের মূল্যায়নে, চলমান কাঠামোগত সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন, সরকারের অর্থনৈতিক উদ্যোগ এবং মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বিত বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকলে আগামী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

