বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা খেলাপি ঋণের বোঝা কমাতে নতুন একটি নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্তে খেলাপি ঋণের বিপরীতে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ সুদ মওকুফ করার সুযোগ পাচ্ছে ব্যাংকগুলো।
ফলে অনেক বড় ঋণগ্রহীতা শুধু মূল ঋণ পরিশোধ করেই দায়মুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য, দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে থাকা ঋণ নিষ্পত্তি করে ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিটকে আরও বাস্তবসম্মত ও পরিচ্ছন্ন করা। তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই উদ্যোগ সাময়িকভাবে খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান কমালেও ভবিষ্যতে ব্যাংকের আয়, মূলধন এবং আমানতকারীদের স্বার্থের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্প্রতি জারি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সার্কুলারে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলো এখন থেকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে আরোপিত এবং অনারোপিত—উভয় ধরনের সুদই নির্দিষ্ট শর্তে মওকুফ করতে পারবে। এর আগে সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে ব্যাংককে প্রথমে আমানতের তহবিল ব্যয়ের অর্থ আদায় নিশ্চিত করতে হতো। নতুন নির্দেশনায় সেই বাধ্যবাধকতা অনেকটাই শিথিল করা হয়েছে। ফলে ঋণ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে আগের তুলনায় বেশি স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোর স্থগিত সুদ হিসাবে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার অনারোপিত সুদ জমা হয়েছে। এই অর্থ এখন পর্যন্ত ব্যাংকের আয় হিসেবে গণ্য হয়নি। নতুন নীতির আওতায় ব্যাংকগুলো চাইলে এই সুদ সম্পূর্ণ মওকুফ করতে পারবে। এর ফলে দীর্ঘদিনের অচল ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা পাওয়া ঋণগ্রহীতারাও এই সুবিধার আওতায় আসবেন। অর্থাৎ, যারা ওই সময়ের মধ্যে বিশেষ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ঋণ নিয়মিত করেছিলেন কিন্তু পরে আবার খেলাপি হয়েছেন, তারাও নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে সুদ মওকুফের সুযোগ পাবেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতাকে শুধু মূল অর্থ পরিশোধ করলেই নিষ্পত্তির সুযোগ দেওয়া হবে। সুদের পুরো অংশ বা উল্লেখযোগ্য অংশ মওকুফ করা হলে দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ দ্রুত নিষ্পত্তি করা সহজ হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, অনারোপিত সুদের বড় অংশ মওকুফ করা হলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে পৌঁছানো খেলাপি ঋণের হার প্রায় ২৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্থগিত সুদ হিসাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো ঋণগ্রহীতা নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ বন্ধ করলে সেই ঋণের ওপর জমা হওয়া সুদকে ব্যাংক আর আয় হিসেবে দেখাতে পারে না। বরং সেই সুদ আলাদা একটি হিসাবে সংরক্ষণ করা হয়। এই অর্থ আদায় না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকের প্রকৃত আয়ের অংশ হিসেবে ধরা হয় না। নতুন নীতিতে এই হিসাবেই জমে থাকা বিপুল অঙ্কের সুদ মওকুফের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
নীতিটি চূড়ান্ত করার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে খেলাপি ঋণ কমানোর বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে মূল ঋণ মওকুফের বিষয়টিও আলোচনায় এলেও অধিকাংশ ব্যাংক সেই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। তাদের মতে, মূল ঋণ মওকুফ ব্যাংক কোম্পানি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তবে স্থগিত সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে তারা তুলনামূলক ইতিবাচক মত দেয়, কারণ এই অর্থ এখনো ব্যাংকের আয়ের অংশ নয়।
ব্যাংকিং খাতের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনে করছেন, আরোপিত সুদ মওকুফের সিদ্ধান্ত প্রতিটি ঋণ আলাদাভাবে বিবেচনা করেই নিতে হবে। কারণ, যে সুদ ইতোমধ্যে আয় হিসেবে হিসাবভুক্ত হয়েছে, সেটি পরে মওকুফ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মুনাফা সরাসরি কমে যাবে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে এর প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টদের একটি অংশের ধারণা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে চলমান আলোচনা এবং ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার চাপও এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের উচ্চ হার আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্বেগের অন্যতম কারণ হয়ে আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে খেলাপি ঋণ, পুনঃতফসিল করা ঋণ এবং অবলোপন করা ঋণ মিলিয়ে দেশের মোট ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এটি ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশের সমান। অর্থাৎ দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার বড় একটি অংশ এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
তবে নতুন নীতির কড়া সমালোচনাও করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তাদের মতে, খেলাপিদের বারবার ছাড় দেওয়ার ফলে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীরা নিরুৎসাহিত হন। এতে একটি ভুল বার্তা যায় যে, সময়মতো ঋণ না দিলেও শেষ পর্যন্ত বিশেষ সুবিধা পাওয়া সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদে এটি ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতিকে আরও দুর্বল করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুদ মওকুফের অর্থ শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের সম্ভাব্য আয় কমে যাওয়া। আর ব্যাংকের আয়ের বড় উৎসই হচ্ছে আমানতকারীদের অর্থ বিনিয়োগ করে অর্জিত মুনাফা। ফলে অতিরিক্ত সুদ মওকুফের প্রভাব শেষ পর্যন্ত আমানতকারীদের ওপরও পড়তে পারে। দুর্বল মূলধনের ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো পূর্বে হিসাবভুক্ত সুদের ওপর কর পরিশোধ করে থাকে। পরে সেই সুদ মওকুফ করা হলে কর সমন্বয়ের সুযোগ কীভাবে দেওয়া হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে ভবিষ্যতে এ নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতের কয়েকজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা মনে করেন, যেসব সুদ কখনো আয় হিসেবে ধরা হয়নি এবং যার বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন রয়েছে, সেগুলো মওকুফ করলে ব্যাংকের মুনাফায় বড় প্রভাব নাও পড়তে পারে। কিন্তু আয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া সুদ মওকুফ করা হলে সরাসরি লোকসান দেখাতে হবে। তাই সব ঋণের ক্ষেত্রে একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে না।
তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে একই ঋণ বারবার পুনঃতফসিল করার পরিবর্তে বাস্তবসম্মত নিষ্পত্তি প্রয়োজন। এককালীন নিষ্পত্তির মাধ্যমে অন্তত মূল অর্থের একটি অংশ উদ্ধার করা গেলে ব্যাংকের অচল সম্পদ কমবে এবং প্রকৃত আর্থিক অবস্থাও পরিষ্কার হবে।
তবে তারা এটিও মনে করেন, শুধু সুদ মওকুফ করে ব্যাংকিং খাতের সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, দ্রুত ঋণ আদায়ের কার্যকর আইনি ব্যবস্থা এবং একটি শক্তিশালী সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান গঠন, যা সংকটাপন্ন ঋণ কিনে নিয়ে ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিটকে সুস্থ করতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দুই বছরে মোট প্রায় দুই লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছিল। কিন্তু এর প্রায় ৪০ শতাংশ আবারও খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, শুধু পুনঃতফসিল করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
ব্যাংকারদের মতে, অনেক প্রতিষ্ঠানের মূল সংকট ছিল অতিরিক্ত ঋণের বোঝা, দুর্বল মূলধন এবং অকার্যকর ব্যবসা পরিচালনা। এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নতুন ঋণ দিয়ে সংকট আরও বাড়ানো হয়েছে। বরং সম্পদ বিক্রি, অতিরিক্ত ব্যয় কমানো, ব্যবসার পরিধি ছোট করা এবং বাস্তবসম্মত পুনর্গঠনের মাধ্যমে টেকসই সমাধান সম্ভব।
সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নীতি স্বল্পমেয়াদে খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান কমাতে এবং অচল ঋণ নিষ্পত্তিতে গতি আনতে সহায়ক হতে পারে। তবে এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে ব্যাংকগুলো কতটা সতর্কতার সঙ্গে নীতিটি বাস্তবায়ন করে, কতটা স্বচ্ছভাবে সুবিধা দেয় এবং একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ সৃষ্টির মূল কারণগুলো দূর করতে কত দ্রুত কার্যকর সংস্কার গ্রহণ করা হয় তার ওপর। অন্যথায় সাময়িকভাবে হিসাবের খাতা পরিষ্কার হলেও ব্যাংকিং খাতের মৌলিক সংকট থেকে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

