ঋণখেলাপি ব্যবসায়িক গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত হলেও শাইনপুকুর সিরামিকস লিমিটেডকে বিশেষ অনুমোদনের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকে ঋণপত্র (এলসি) খোলার সুযোগ দিয়েছে সরকার। ব্যাংক কোম্পানি আইনের নির্দিষ্ট বিধান থেকে অব্যাহতি দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় এই অনুমতি দিয়েছে।
তবে একই সঙ্গে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, এই সুবিধা থেকে ভবিষ্যতে কোনো আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হলে তার দায় সরকার বা অর্থ বিভাগ নেবে না। বিশ্লেষকদের মতে, শিল্পকারখানার উৎপাদন সচল রাখার প্রয়োজনীয়তা এবং ব্যাংকিং শৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জের মধ্যেই এ সিদ্ধান্ত এসেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শাইনপুকুর সিরামিকস ১০০ শতাংশ নগদ মার্জিনের ভিত্তিতে সোনালী ব্যাংকে এলসি খুলতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশের পর ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় বিশেষ অব্যাহতি দিয়ে এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
শাইনপুকুর সিরামিকস বেক্সিমকো গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান। পুরো গ্রুপ বর্তমানে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত থাকায় প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির এলসি খোলার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। যদিও সংশ্লিষ্টদের দাবি, শাইনপুকুর নিজে পৃথকভাবে খেলাপি প্রতিষ্ঠান নয়, তবে একই গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আইনগতভাবে সেই সীমাবদ্ধতার আওতায় পড়ে।
অর্থ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো চিঠিতে জানিয়েছে, এই বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ফলে ভবিষ্যতে সোনালী ব্যাংক সরকারের কাছে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা দাবি করতে পারবে না। একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের কারণে সৃষ্ট কোনো দায়-দায়িত্বও অর্থ বিভাগের ওপর বর্তাবে না বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, শাইনপুকুর সিরামিকসের সব আয় একটি নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে জমা রাখতে হবে। সেই হিসাব থেকে নিয়মিত আনুপাতিক হারে সোনালী ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ঋণ আদায়ে কোনো অনিশ্চয়তা না থাকে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো ঋণখেলাপি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে সাধারণভাবে নতুন ঋণ বা ঋণসুবিধা দেওয়া যায় না। তবে আইনে একটি ব্যতিক্রম রয়েছে। যদি কোনো ব্যবসায়িক গ্রুপের খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে বিবেচনা না করা হয় অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে যে খেলাপির পেছনে যৌক্তিক কারণ রয়েছে, তাহলে সরকারের অনুমোদন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী একই গ্রুপের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ ক্ষেত্রে ঋণসুবিধা দেওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বেক্সিমকো গ্রুপের বর্তমান অবস্থার কারণে শাইনপুকুর সিরামিকসকে এই সুবিধা দিতে সরকারের অনুমোদন অপরিহার্য ছিল। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অব্যাহতির পর এখন এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারি করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
শাইনপুকুর সিরামিকসের নির্বাহী পরিচালক ও কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ আসাদ উল্লাহ বলেন, প্রতিষ্ঠানটি নিজে খেলাপি নয়। তবে একই পরিচালনা পর্ষদের কারণে গ্রুপের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এটি খেলাপির আওতায় চলে এসেছে। তার দাবি, বেক্সিমকো গ্রুপ ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি নয়। ২০২৫ সাল পর্যন্তও প্রতিষ্ঠানটি খেলাপি ছিল না। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ছাঁটাই করতে হয়, যার প্রভাব ব্যবসার ওপর পড়ে।
সোনালী ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, শিল্পকারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখার স্বার্থেই এই আবেদন করা হয়েছিল। তার মতে, উৎপাদন অব্যাহত থাকলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এদিকে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নীতিগত পরিবর্তন আনে, যার মাধ্যমে কোনো ব্যবসায়িক গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলেও একই গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট শর্তে ব্যাংকঋণ পাওয়ার সুযোগ পায়। তবে এর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিশ্চিত হতে হয় যে খেলাপি হওয়া ইচ্ছাকৃত ছিল না এবং তা যৌক্তিক পরিস্থিতির কারণে ঘটেছে।
এর আগে একই গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে পুরো গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও কার্যত নতুন ঋণসুবিধা থেকে বঞ্চিত হতো। নীতিগত এই পরিবর্তনের মাধ্যমে সেই কঠোর অবস্থান কিছুটা শিথিল করা হলেও দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমেনি; বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আরও বেড়েছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, উৎপাদনশীল শিল্পকে সচল রাখতে প্রয়োজন হলে বিশেষ সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে ঝুঁকি মূল্যায়ন, কঠোর নজরদারি এবং অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় এমন বিশেষ অব্যাহতি ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে নৈতিক ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

