দেশের ব্যাংক খাতে আয়ের কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। কয়েক বছর আগেও ব্যাংকগুলোর প্রধান আয় আসত ব্যবসা ও শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ থেকে। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। খেলাপি ঋণের উচ্চহার, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ধীরগতির কারণে ব্যাংকগুলো ক্রমেই ঋণ ব্যবসা থেকে সরে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
ফলে বর্তমানে অনেক ব্যাংকের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ, যা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র চার বছরের ব্যবধানে আয়ের উৎসে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। ২০২১ সালে দেশের ৫২টি প্রধান ব্যাংকের মোট আয়ের প্রায় ৪৭ শতাংশ এসেছিল ঋণের সুদ থেকে। সরকারি সিকিউরিটিসহ বিভিন্ন বিনিয়োগ থেকে এসেছিল প্রায় ৩৪ শতাংশ এবং বাকি অংশ ছিল কমিশন ও অন্যান্য সেবা থেকে অর্জিত আয়।
পরবর্তী দুই বছরেও ঋণভিত্তিক আয় তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ থেকে অর্জিত আয় ঋণের সুদকে ছাড়িয়ে যায়। ২০২৫ সালে এসে এই ব্যবধান আরও বেড়েছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর মোট আয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশ এসেছে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে। বিপরীতে ঋণ ব্যবসা থেকে পাওয়া নিট সুদ আয় নেমে এসেছে মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশে। কমিশন ও অন্যান্য সেবা থেকে এসেছে প্রায় ২০ শতাংশ আয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি। বিপুল পরিমাণ ঋণ অনাদায়ী হয়ে থাকায় ব্যাংকগুলো প্রত্যাশিত সুদ আদায় করতে পারছে না। অন্যদিকে আমানতকারীদের সুদ পরিশোধ এবং পরিচালন ব্যয় নিয়মিত বহন করতে হচ্ছে। ফলে ঋণ ব্যবসার মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
একই সময়ে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে তুলনামূলক উচ্চ সুদ এবং প্রায় ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের সুযোগ ব্যাংকগুলোর জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ফলে অনেক ব্যাংক নতুন ঋণ বিতরণের পরিবর্তে সরকারি সিকিউরিটিতে অর্থ বিনিয়োগকে নিরাপদ ও লাভজনক বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি স্বল্পমেয়াদে ব্যাংকগুলোর মুনাফা ধরে রাখতে সহায়তা করলেও দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ ব্যাংকের মূল কাজ হলো উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দিয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখা। যদি ব্যাংকগুলো সেই ভূমিকা থেকে সরে গিয়ে কেবল সরকারকে ঋণ দিতেই বেশি আগ্রহী হয়, তাহলে শিল্প, ব্যবসা ও বিনিয়োগ খাত প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এর ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যেতে পারে, নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা ধীর হবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও দীর্ঘমেয়াদে চাপের মুখে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করছেন, সরকারি সিকিউরিটিনির্ভর আয়ের এই প্রবণতা চিরস্থায়ী নয়। বর্তমানে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে সুদের হার তুলনামূলক বেশি থাকায় ব্যাংকগুলো লাভবান হচ্ছে। কিন্তু ভবিষ্যতে সুদের হার কমে গেলে এই আয়ের উৎসও সংকুচিত হবে। তখন ঋণ ব্যবসা দুর্বল থাকলে ব্যাংকগুলোর লাভজনকতা আবারও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
ব্যাংক খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস ছিল বৈদেশিক বাণিজ্য ও কমিশনভিত্তিক সেবা। কিন্তু আমদানি-রপ্তানির গতি কমে যাওয়ায় এলসি খোলা, বৈদেশিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং সেবা থেকেও আয় কমেছে। পাশাপাশি কয়েক বছর ধরে শেয়ারবাজারে লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ায় যেসব ব্যাংকের নিজস্ব ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদের কমিশন আয়ও কমে গেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল প্রায় ১ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। এরপর ধারাবাহিকভাবে লেনদেন কমে ২০২৫ সালে তা মাত্র ৫১ কোটি টাকায় নেমে আসে। ফলে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাতকে আবারও মূল ব্যবসায় ফিরিয়ে আনতে হলে খেলাপি ঋণ কমানো, আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা জরুরি। একই সঙ্গে শিল্প ও ব্যবসা খাতে আস্থা ফিরিয়ে এনে ঋণের চাহিদা বাড়াতে হবে। অন্যথায় সরকারি সিকিউরিটির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ব্যাংকগুলোর জন্য যেমন ঝুঁকি তৈরি করবে, তেমনি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকেও দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকের সুস্থ আর্থিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো উৎপাদনশীল খাতে ঋণ বিতরণ। তাই সাময়িক লাভের পরিবর্তে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোর আয়ের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক খাতে কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের অন্যতম বড় প্রয়োজন।

