আন্তর্জাতিক সুদের হারের অস্থিরতার কারণে আমদানিকারকদের বাড়তি আর্থিক চাপ কমাতে নতুন একটি আর্থিক উপকরণের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে নির্দিষ্ট শর্তে বিদেশি ঋণে অর্থায়ন করা আমদানিকারকরা ভবিষ্যতের সুদের হার আগেই নির্ধারণ করে রাখতে পারবেন। এতে বৈশ্বিক সুদের হার হঠাৎ বেড়ে গেলেও অতিরিক্ত ব্যয়ের ঝুঁকি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, ইউজেন্স আমদানি, সরবরাহকারী ঋণ (সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট) এবং ক্রেতা ঋণ (বায়ার্স ক্রেডিট) সুবিধার আওতায় আমদানি অর্থায়নের ক্ষেত্রে অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের সঙ্গে ফরওয়ার্ড রেট চুক্তি করতে পারবে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক বৈদেশিক ঋণের সুদের হার নির্ধারিত হয় এসওএফআর (সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট)সহ বিভিন্ন বৈশ্বিক মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে। এসব হার সময়ের সঙ্গে ওঠানামা করায় আমদানিকারকদের ঋণের প্রকৃত ব্যয়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। নতুন ব্যবস্থায় ভবিষ্যতের জন্য একটি নির্দিষ্ট সুদের হার আগে থেকেই চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারণ করা যাবে। ফলে সুদের হার বেড়ে গেলেও অতিরিক্ত ব্যয়ের ধাক্কা থেকে সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, এই সুবিধা কেবল প্রকৃত আমদানি লেনদেনের সুদের ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য ব্যবহার করা যাবে। কোনো অবস্থাতেই এটি মুনাফার উদ্দেশ্যে ফটকাবাজি বা ঝুঁকিপূর্ণ আর্থিক অবস্থান তৈরির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, চুক্তিতে নির্ধারিত সুদের হার এবং নির্ধারিত সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচলিত সুদের হারের পার্থক্যের ভিত্তিতে লেনদেন নিষ্পত্তি করা হবে। অর্থাৎ প্রকৃত সুদের হার যেদিকে যাক না কেন, চুক্তির মাধ্যমে ঝুঁকি সীমিত রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
ব্যাংকগুলোর জন্যও কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কোনো ফরওয়ার্ড রেট চুক্তি সম্পাদনের পর একই দিন আন্তর্জাতিক বাজারে সমপরিমাণ বিপরীতমুখী লেনদেনের মাধ্যমে সেই ঝুঁকি সমন্বয় করতে হবে। ফলে ব্যাংক নিজস্ব হিসাবে অতিরিক্ত বাজারঝুঁকি বহন করতে পারবে না।
এ ছাড়া গ্রাহকের কাছ থেকে মূল্য নির্ধারণে ব্যাংকের মার্জিন সর্বোচ্চ ১০ বেসিস পয়েন্ট বা ভিত্তি পয়েন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। একই সঙ্গে একটি ব্যাংকের মোট ফরওয়ার্ড রেট চুক্তির পরিমাণ তার আগের ১২ মাসের গড় মাসিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের ২৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চুক্তি কাঠামো অনুসরণ করতে হবে। প্রতিদিন বাজারদরের ভিত্তিতে চুক্তির মূল্যায়ন, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজন হলে আগাম চুক্তি সমাপ্তির ক্ষেত্রেও বাজারদর অনুযায়ী নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব নথি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে ওঠানামা করেছে। ফলে বিদেশি ঋণের মাধ্যমে কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি বা শিল্পপণ্য আমদানিকারকদের ব্যয়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফরওয়ার্ড রেট চুক্তির মাধ্যমে এই অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে এবং ব্যবসায়ীরা আগেই অর্থায়নের প্রকৃত ব্যয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে ফরওয়ার্ড রেট চুক্তি দীর্ঘদিন ধরেই সুদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কার্যকর উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই অনুমোদন আমদানি অর্থায়নকে আরও আধুনিক ও ঝুঁকিনিয়ন্ত্রিত কাঠামোয় নিয়ে যেতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে দেশে আর্থিক ডেরিভেটিভস বাজার বিকাশের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, নতুন এই ব্যবস্থার ফলে আমদানিকারক, ব্যাংক এবং সামগ্রিক বৈদেশিক বাণিজ্য খাত আন্তর্জাতিক সুদের হার পরিবর্তনের ধাক্কা মোকাবিলায় আরও প্রস্তুত থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়ন ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বাড়বে।

