বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংকটে জর্জরিত। তবে বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম খেলাপি ঋণ। বছরের পর বছর ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে আছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নতুন ঋণ বিতরণ, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। অনেক ব্যাংক এখন নতুন ঋণ দিতে হিমশিম খাচ্ছে, আবার কোথাও আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতেও চাপ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য একদিকে বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করেছে, অন্যদিকে ১৮ মাস মেয়াদি একটি সংস্কার কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন অর্থনীতি সংশ্লিষ্টদের প্রধান আলোচনার বিষয়।
খেলাপি ঋণের বোঝা কেন এত বড় উদ্বেগ?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাস শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে এই অঙ্ক প্রায় ৩১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বেড়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী খেলাপি ঋণ, পুনঃতফসিল করা ঋণ এবং অবলোপন করা ঋণ মিলিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এই বিপুল অর্থ ব্যাংকের বাইরে আটকে থাকায় নতুন শিল্পে অর্থায়ন কমছে, বিনিয়োগের গতি শ্লথ হচ্ছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে তারল্যের চাপ বাড়ছে।
সুদ মওকুফ করে মূলধন ফেরানোর উদ্যোগ
এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বিশেষ নীতিমালা ঘোষণা করেছে।
এতে বলা হয়েছে, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত যেসব ঋণ ‘মন্দ’ বা ‘ক্ষতিজনক’ হিসেবে শ্রেণিকৃত হয়েছে, সেই ঋণগ্রহীতারা যদি ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে মূল ঋণ এককালীন পরিশোধ করেন, তাহলে তাদের ওপর আরোপিত এবং অনারোপিত সুদ সম্পূর্ণ মওকুফ করার সুযোগ থাকবে।
এর আগে সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে ব্যাংকের তহবিল ব্যয়ের একটি অংশ আদায় বাধ্যতামূলক ছিল। নতুন নীতিমালায় সেই শর্তও তুলে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারণা, দীর্ঘদিন ধরে আদায় না হওয়া ঋণ থেকে অন্তত মূলধন উদ্ধার করা গেলে ব্যাংকের তারল্য বাড়বে এবং সেই অর্থ আবার উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে।
কেন এই বিশেষ ছাড়?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, সব খেলাপি ঋণগ্রহীতা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করেননি—এমন নয়। অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসায়িক মন্দা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদের চাপ কিংবা বাজার সংকটের কারণে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছেন।
এমন ব্যবসায়ীদের জন্য শেষবারের মতো একটি সুযোগ তৈরি করতেই এই বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কৃষি, কুটির শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতকে এই সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
সবাই কি এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন?
না। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যবসায়ী মহলের মধ্যেও ভিন্নমত রয়েছে।
নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী অনেক উদ্যোক্তার অভিযোগ, যারা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করেছেন তারা কোনো ধরনের বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন না। অথচ বছরের পর বছর ঋণ না দেওয়া ব্যক্তিরাই সুদ মওকুফের সুযোগ পাচ্ছেন। এতে নিয়ম মেনে চলা গ্রাহকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে শিল্প খাতের অনেক উদ্যোক্তা মনে করেন, বর্তমানে ব্যাংকগুলোর আটকে থাকা অর্থ ফিরিয়ে আনাই সবচেয়ে জরুরি। সে বিবেচনায় এই উদ্যোগ বাস্তবসম্মত। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছেন, যেন কোনোভাবেই ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা এই সুযোগের অপব্যবহার করতে না পারেন।
১৮ মাসের সংস্কার পরিকল্পনায় কী থাকছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য ধাপে ধাপে ১৮ মাসের একটি সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
এই পরিকল্পনার আওতায় অর্থঋণ আদালতের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা মামলাগুলো ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা যায়।
এ ছাড়া খারাপ ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন আইন প্রণয়ন, আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুযায়ী ঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু, ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার, মন্দ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আধুনিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং ডিজিটাল লেনদেন আরও সমন্বিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, বছরের পর বছর ব্যালান্স শিটে অকার্যকর সম্পদ রেখে প্রকৃত আর্থিক অবস্থা আড়াল করার সুযোগ আর থাকবে না।
কারা এই সুবিধা পাবেন?
এই সুবিধা সবাই পাবেন না।
শুধুমাত্র চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ‘মন্দ ও ক্ষতিজনক’ হিসেবে শ্রেণিকৃত ঋণই এই নীতিমালার আওতায় আসবে। পরবর্তীকালে একই শ্রেণিতে যাওয়া ঋণ আপাতত এই সুবিধা পাবে না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুদ মওকুফ কোনো স্বয়ংক্রিয় সুবিধা নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে পর্যালোচনা করবে। ঋণগ্রহীতার আর্থিক অবস্থা, ব্যবসা চালানোর সক্ষমতা, অতীতের লেনদেন এবং ঋণ পরিশোধে আন্তরিকতা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সত্যিই কি টাকা ফিরে আসবে?
এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু অর্থ অবশ্যই উদ্ধার করা সম্ভব। বিশেষ করে যেসব উদ্যোক্তা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন কিন্তু অতিরিক্ত সুদের চাপে ঋণ পরিশোধ করতে পারছিলেন না, তারা এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন।
কিন্তু বড় করপোরেট খেলাপিদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। গত এক দশকে অনিয়ম, জালিয়াতি কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে বিতরণ হওয়া অনেক বড় ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে। অনেক ঋণগ্রহীতা দেশের বাইরেও অবস্থান করছেন। ফলে শুধু সুদ মওকুফ করলেই এসব অর্থ পুরোপুরি উদ্ধার করা সম্ভব হবে—এমন আশা বাস্তবসম্মত নয়।
সফলতার মূল শর্ত কোথায়?
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর।
প্রথমত, প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে থাকা উদ্যোক্তা এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিকে স্পষ্টভাবে আলাদা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী কোনো গোষ্ঠী যেন এই সুবিধার অপব্যবহার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, এটিকে এককালীন সুযোগ হিসেবেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। বারবার একই ধরনের সুবিধা দেওয়া হলে নিয়মিত ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
চতুর্থত, অর্থঋণ আদালতের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি, সম্পদ জব্দ এবং আইনি ব্যবস্থা কার্যকর না হলে খেলাপি ঋণ আদায়ে বড় পরিবর্তন আসবে না।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ব্যাংক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। যদি আটকে থাকা মূলধনের উল্লেখযোগ্য অংশ উদ্ধার করা যায়, তাহলে ব্যাংকের তারল্য বাড়বে, নতুন ঋণ বিতরণ সহজ হবে এবং শিল্প-বিনিয়োগেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার সব খেলাপি ঋণ একসঙ্গে ব্যাংকে ফিরে আসবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
সবশেষে বলা যায়, সুদ মওকুফ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; এটি মূলধন উদ্ধারের একটি কৌশল মাত্র। এই কৌশল কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে নীতিমালার স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘমেয়াদি সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর। আগামী ১৮ মাসই বলে দেবে, এই সংস্কার পরিকল্পনা দেশের ব্যাংকিং খাতে সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে পারে কি না।

