আর্থিক সংকট, বিপুল খেলাপি ঋণ এবং মূলধনের ঘাটতির চাপে নতুন আয়ের উৎস খুঁজতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে দেশের প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংক। রাজধানীর পান্থপথে নির্মাণাধীন নিজস্ব ‘টুইন টাওয়ার’-এর একটি ভবন বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দিয়ে নিয়মিত আয় করতে চায় ব্যাংকটি।
তবে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ব্যাংকের নিজস্ব কার্যালয় হিসেবে অনুমোদিত ভবন ভাড়া দিয়ে ব্যবসায়িক আয় করার সুযোগ না থাকায় বিশেষ আইনি অব্যাহতি চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ন্যাশনাল ব্যাংক মনে করছে, নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর পুরো ভবন কেবল নিজেদের ব্যবহারের জন্য রাখলে তা আর্থিকভাবে লাভজনক হবে না। বরং একটি টাওয়ার দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া গেলে স্থায়ী সম্পদ থেকে নিয়মিত আয় হবে। এতে পরিচালন ব্যয় সামাল দেওয়া, নগদ প্রবাহ বাড়ানো এবং আর্থিক অবস্থার উন্নতিতে সহায়তা মিলতে পারে।
এ লক্ষ্যে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিশেষ অনুমতির আবেদন করা হয়। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টি বিবেচনা করে গত ২৯ জুন অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠিয়ে ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান থেকে ন্যাশনাল ব্যাংককে সীমিত পরিসরে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে বলে দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বর্তমান ব্যাংক কোম্পানি আইনে একটি ব্যাংক কী ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে এবং কোন কোন উৎস থেকে আয় করতে পারবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা রয়েছে। সেখানে নিজস্ব প্রধান কার্যালয় হিসেবে নির্মিত ভবন বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দিয়ে আয় করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। ফলে সরকারের বিশেষ অনুমোদন ছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়েই রাজধানীর পান্থপথে ‘এনবিএল টুইন টাওয়ার’ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। মূল পরিকল্পনা ছিল ভবনটি ব্যাংকের নিজস্ব প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকটির আর্থিক বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গেছে। ব্যালান্স শিট শক্তিশালী করা, ব্যয় কমানো এবং মূলধনের অবস্থান উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় পরিচালনা পর্ষদ দ্বিতীয় টাওয়ারটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ব্যাংকটির যুক্তি হলো, ভবনটি ইজারা দেওয়া গেলে এটি থেকে নিয়মিত নন-ফান্ডেড আয় সৃষ্টি হবে। ফলে শুধুমাত্র ঋণনির্ভর আয়ের ওপর নির্ভরশীলতা কিছুটা কমবে। একই সঙ্গে স্থায়ী সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে এবং ভবিষ্যৎ পরিচালন কার্যক্রমও সহজ হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ন্যাশনাল ব্যাংকের স্থাবর সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে আইনে নির্ধারিত সীমারও বেশি। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী একটি ব্যাংক নির্দিষ্ট সীমার বেশি স্থাবর সম্পত্তি নিজের মালিকানায় রাখতে পারে না। এই বাস্তবতাও ব্যাংকটির জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
পান্থপথে প্রায় ৬৪ কাঠা জমির ওপর নির্মাণাধীন টুইন টাওয়ার প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে। প্রকল্পে তিনটি বেজমেন্টসহ ১২ তলা করে দুটি টাওয়ার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের নকশায় প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হলেও দীর্ঘ সময় ধরে এটি ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রথম টাওয়ারের নির্মাণকাজ এখনও চলমান। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ভবনেই ভবিষ্যতে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অর্থ ছাড় ধাপে ধাপে হওয়ায় কাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। অন্যদিকে দ্বিতীয় টাওয়ারের মূল কাঠামো নির্মাণ হলেও সেখানে দীর্ঘদিন ধরে কার্যত কোনো অগ্রগতি নেই।
ব্যাংকটির এই প্রস্তাব নিয়ে ইতোমধ্যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নিজস্ব অফিস ভবন ভাড়া দিয়ে আয় করার সুযোগ নেই। তাই এ ধরনের অনুমোদন দিলে ভবিষ্যতে অন্য ব্যাংকও একই ধরনের দাবি তুলতে পারে, যা আইনের সমতা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর জন্য নতুন প্রশ্ন তৈরি করবে।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের একটি অংশও এই উদ্যোগ নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সংকট থেকে বের করে আনতে মূল গুরুত্ব হওয়া উচিত খেলাপি ঋণ আদায়, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, মূলধন শক্তিশালী করা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করার ওপর। বিশেষ আইনি ছাড় দিয়ে নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করলে তা সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হবে না।
ন্যাশনাল ব্যাংকের আর্থিক সূচকও উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ এখন খেলাপি। অর্থমূল্যে যার পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। এসব ঋণের বড় অংশই দীর্ঘদিন ধরে আদায়যোগ্য নয় বলে বিবেচিত হচ্ছে।
এছাড়া ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে মূলধন ঘাটতি ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি ছিল। একই সময়ে মূলধন পর্যাপ্ততার হার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক নিচে অবস্থান করেছে, যা ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা বলছেন, বছরের পর বছর বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং প্রভাবশালী গ্রাহকদের বিপুল ঋণ আদায় না হওয়ার কারণে ব্যাংকটি বর্তমান সংকটে পড়েছে। তাদের দাবি, অতীতে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ হলেও তার উল্লেখযোগ্য অংশ আর ফেরত আসেনি। ফলে খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি এবং মূলধনের সংকট ধীরে ধীরে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাশনাল ব্যাংকের ভবন ভাড়া দেওয়ার পরিকল্পনা কেবল একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশের দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক বাস্তবতারও প্রতিফলন। এখন সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে ব্যাংকটি বিশেষ আইনি সুবিধা পাবে কি না। তবে অনুমোদন মিললেও বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবন ভাড়ার আয় একা ব্যাংকের গভীর আর্থিক সংকট কাটিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট হবে না। স্থায়ী সমাধানের জন্য খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, কার্যকর সুশাসন, মূলধন জোরদার এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই।

