কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার মতো শক্তিশালী প্রযুক্তি হিসেবে আবির্ভূত হলেও এর সম্ভাবনার পাশাপাশি বাড়ছে গভীর উদ্বেগও। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আর্থিক সেবা সম্প্রসারণ এবং ব্যবসায়িক দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হলেও প্রযুক্তিটির অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার আর্থিক স্থিতিশীলতা, শ্রমবাজার, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সাইবার নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা।
বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এই উদ্বেগ উঠে এসেছে পর্তুগালের সিন্ত্রায় ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বার্ষিক নীতিনির্ধারণী সম্মেলনে। সেখানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এআই এখন শুধু প্রযুক্তি খাতের বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, মুদ্রানীতি এবং আর্থিক বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এআইয়ের ভবিষ্যৎ প্রভাব সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো ধারণা নেই। প্রযুক্তিটি প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত সফল হলে শ্রমবাজার, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং আর্থিক খাতে আকস্মিক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। আবার বিপুল বিনিয়োগের পরও যদি প্রত্যাশিত ফল না আসে, তাহলে প্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি এবং বিনিয়োগ সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বিশ্বের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এআই অবকাঠামো নির্মাণে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা সেন্টার এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরিতে এই বিপুল ব্যয় সাময়িকভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে শক্তিশালী করলেও এর মধ্যে অতিরিক্ত জল্পনা-কল্পনার ঝুঁকিও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, বর্তমান এআই বিনিয়োগের ধারা অতীতের কয়েকটি বড় আর্থিক বুদবুদের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। ব্রিটেনের রেলওয়ে বিনিয়োগ উন্মাদনা, বিশ শতকের শেয়ারবাজারের অস্বাভাবিক উত্থান কিংবা নব্বইয়ের দশকের ডট-কম সংকটের মতো পরিস্থিতি আবারও তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টসও জানিয়েছে, এআই খাতে বর্তমান বিনিয়োগের গতি ভবিষ্যতে বাজারে বড় ধরনের মূল্য সংশোধনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আর্থিক বাজারে এআইভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় লেনদেন নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বের বড় শেয়ারবাজারগুলোতে অ্যালগরিদমভিত্তিক লেনদেনের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। তবে আরও উন্নত এআই ব্যবহারের ফলে এসব স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই জটিল সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এতে বাজারে কৃত্রিমভাবে সম্পদের দাম বাড়ানো, অতিরিক্ত জল্পনা সৃষ্টি কিংবা হঠাৎ বড় ধরনের দরপতনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে উন্নত এআইভিত্তিক ট্রেডিং সিস্টেম একে অপরের আচরণ বিশ্লেষণ করে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা বাজারে অস্বাভাবিক ওঠানামা সৃষ্টি করবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এমন পরিস্থিতিতে কারসাজির উৎস শনাক্ত করা বা দায় নির্ধারণ করা নিয়ন্ত্রকদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ব্যাংকিং খাতেও এআই বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করছে। উন্নত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নতুন ব্যবসায়ী এবং আগে ব্যাংকিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত অনেক মানুষ সহজে ঋণ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। এআই কীভাবে কোনো ঋণ অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করছে, তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ নয়। বিশেষজ্ঞরা একে ‘ব্ল্যাক বক্স’ সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করছেন। অর্থাৎ সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা নিরীক্ষকদের পক্ষে সহজে যাচাই করা সম্ভব হয় না। এতে জবাবদিহি ও তদারকির ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তাকেও সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হিসেবে দেখছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা। এআই ব্যবহারের মাধ্যমে সাইবার হামলা আগের তুলনায় আরও জটিল ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ছোট আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোর জন্য এ ধরনের হামলা মোকাবিলা করা ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। ফলে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা রক্ষায় নতুন ধরনের নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
কিছু নীতিনির্ধারক সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় যৌথ নিরাপত্তা ও বীমা ব্যবস্থার প্রস্তাবও দিয়েছেন। তাদের মতে, কোনো একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের সাইবার হামলার শিকার হলে বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্য প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে তার গুরুত্বপূর্ণ সেবা চালিয়ে যেতে পারলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা কমানো সম্ভব হবে।
এআই অর্থনৈতিক বৈষম্যও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সক্ষমতা বড় অর্থনীতি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বেশি থাকায় তারা দ্রুত সুবিধা পাবে। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশ, ছোট ব্যবসা এবং সীমিত সম্পদের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আয় ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ব্যবধান আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও ঝুঁকির নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান এবং আর্থিক সেবার প্রসারের সুযোগ থাকলেও যথাযথ নীতিমালা, কার্যকর তদারকি এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় ছাড়া এই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের গতি বুঝে সময়োপযোগী নীতি গ্রহণ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো আগেভাগেই মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া।

