ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরে নিজের ডেস্কে বসার আগেই চাকরি হারানোর খবর—এমন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন ইসলামী ব্যাংকের একাধিক সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের অভিযোগ, ওমরাহ পালন, মাতৃত্বকালীন ছুটি কিংবা দুর্ঘটনার কারণে বৈধ ছুটিতে থাকা অবস্থায় কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এতে শুধু তারা নয়, তাদের পরিবারের সদস্যরাও চরম আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়েছেন।
চাকরিচ্যুতদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষার্ধে ব্যাংকে একটি মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু করা হয়। ওই সময় অনেক কর্মকর্তা ছুটিতে থাকায় পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। তাদের দাবি, পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ না দিয়েই পরবর্তীতে চাকরি থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। অনেকেই দেশে বা কর্মস্থলে ফিরে এসে জানতে পারেন, তাদের চাকরি আর নেই।
এক কর্মকর্তা জানান, তিনি ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর অফিসের অনুমতি নিয়ে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যান। বিদেশে অবস্থানকালে ২৩ সেপ্টেম্বর একটি পরীক্ষার নোটিশ জারি করা হয় এবং ২৭ সেপ্টেম্বর পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি তখন দেশে না থাকায় পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। ৫ অক্টোবর দেশে ফিরে পরদিন কর্মস্থলে যোগ দিলেও কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তার দাবি, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আগে জানিয়েছিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হলে চাকরি বহাল থাকবে। কিন্তু তিনি সেই সুযোগই পাননি।
আরেক নারী কর্মকর্তা জানান, তিনি ২০১৯ সালে ব্যাংকের একটি শাখায় যোগ দেন এবং দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরের শেষদিকে অনুমোদিত মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যান। ছুটি শেষে ফিরে এসে জানতে পারেন, তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, সন্তানের জন্মের পর নতুন জীবনের পরিকল্পনা করলেও চাকরি হারানোর কারণে এখন পরিবার পরিচালনা এবং শিশুর মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, কোনো ধরনের ব্যাখ্যা বা অভিযোগ জানার সুযোগ না দিয়েই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা তার কাছে অন্যায় বলে মনে হয়েছে।
দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত আরেক কর্মকর্তা জানান, ২০১৯ সালে ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পর নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর অফিসে যাওয়ার পথে তিনি ও তার স্ত্রী ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন। দুর্ঘটনায় তাদের সঙ্গে থাকা এক স্বজন মারা যান। তার দুই পা ভেঙে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত লাগে। দীর্ঘ চিকিৎসার মধ্যেই তিনি চাকরিচ্যুতির চিঠি পান। বর্তমানে তিনি ও তার স্ত্রী এখনো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে পরিবার আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চাকরি হারানো তাদের জন্য আরও বড় সংকট তৈরি করেছে বলে তিনি দাবি করেন।
চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠন ‘চিটাগাং অ্যালায়েন্স’-এর আহ্বায়কের দাবি, ওমরাহ, অসুস্থতা, মাতৃত্বকালীন ছুটি কিংবা অন্য বৈধ কারণে কর্মস্থলের বাইরে থাকা আরও অনেক কর্মকর্তা একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। তার অভিযোগ, কেউ ছুটি থেকে ফিরে কাজে যোগ দেওয়ার সুযোগই পাননি, আবার কেউ কয়েক দিন কাজ করার পর চাকরিচ্যুতির চিঠি হাতে পেয়েছেন। তাদের মতে, এসব সিদ্ধান্তে মানবিক দিকটি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, চাকরিচ্যুতির আগে অনেক ক্ষেত্রেই কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়নি কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও তৈরি করা হয়নি। ফলে তারা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন নিয়মিত দায়িত্ব পালনের পর হঠাৎ চাকরি হারানোয় অনেক পরিবার আয়ের একমাত্র উৎস থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফলে চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা, বাসাভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানে পুনর্গঠন বা কর্মী মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সেটি আইন, নীতিমালা এবং মানবিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়ন করা জরুরি। বিশেষ করে অনুমোদিত ছুটি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা কিংবা গুরুতর অসুস্থতার মতো বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। অন্যথায় এমন সিদ্ধান্ত কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগের বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এখনো জানা যায়নি।

