দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সেবাদান থেকে আরও বিস্তৃত পরিসরে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দিতে নতুন ব্যবসায়িক কৌশল ঘোষণা করেছে ব্র্যাক ব্যাংক।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে ‘মিসিং মিডল’ থেকে ‘মিসিং মেজরিটি’ মিশনে যাত্রার ঘোষণা দিয়ে ব্যাংকটি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এমন একটি সমন্বিত ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য, যেখানে একজন গ্রাহক তার সব ধরনের আর্থিক চাহিদার সমাধান একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাবেন। এই লক্ষ্যকে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ‘ব্যাংক খাতের অ্যামাজন’ হওয়ার স্বপ্ন হিসেবে তুলে ধরেছেন।
রোববার (৫ জুলাই) ব্র্যাক ব্যাংকের ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ব্যাংকের চেয়ারম্যান এ ঘোষণা দেন। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, গত আড়াই দশক ধরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে যে সফলতা অর্জিত হয়েছে, সেটিকে ভিত্তি করে এবার আরও বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এতদিন ব্যাংকটির প্রধান কৌশল ছিল এমন উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ানো, যারা প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত গুরুত্ব পেতেন না। নতুন পরিকল্পনায় সেই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করে দেশের বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষকে সহজ, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং গ্রাহকের প্রয়োজনভিত্তিক সেবার মাধ্যমে এমন একটি ব্যাংকিং পরিবেশ গড়ে তোলা হবে, যেখানে শহর-গ্রাম, আয় কিংবা পেশার ভিন্নতা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। নতুন প্রজন্মের কর্মজীবী, নারী, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী, মুক্ত পেশাজীবী এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে এই উদ্যোগের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বর্তমানে দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মাত্র ২৮ শতাংশ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করেন। অর্থাৎ প্রায় ৭২ শতাংশ মানুষ এখনও প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসাই নতুন কৌশলের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
ব্যাংকটির চেয়ারম্যান বলেন, গত ২৫ বছরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে ব্র্যাক ব্যাংক একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে। এ সময়ে প্রায় ২০ লাখ উদ্যোক্তাকে ঋণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং বিতরণ করা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকারও বেশি এসএমই ঋণ। এত বড় ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করেও খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে ব্যাংকটি, যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতারও প্রতিফলন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাও। তিনি বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর এবং টেকসই অর্থায়নকে কেন্দ্র করে ব্র্যাক ব্যাংক দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও প্রযুক্তিনির্ভর ও গ্রাহকবান্ধব সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে সেই অবদান আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, ২০২৩ সালে দেশে আসা প্রায় ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্সের মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ব্র্যাক ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে, যা মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৭ শতাংশ। এছাড়া নারীদের জন্য চালু করা বিশেষায়িত ‘তারা’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ইতোমধ্যে পাঁচ লাখের বেশি নারী গ্রাহক ও উদ্যোক্তা ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
ব্যাংকটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের রিটেইল ব্যাংকিং পোর্টফোলিওর আকার প্রায় ৬৩ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের অন্যতম বৃহৎ। একই সঙ্গে প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার মোট পোর্টফোলিও পরিচালনা করছে ব্যাংকটি, যার ৮৩ শতাংশ টেকসই অর্থায়নের আওতায় রয়েছে। অন্যদিকে বিকাশের মাধ্যমে বর্তমানে ৮ কোটিরও বেশি মানুষ ডিজিটাল আর্থিক সেবা গ্রহণ করছেন, যা দেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার বিস্তৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রেও নিজেদের কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত ২৫ বছরে বিভিন্ন করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উপকৃত হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এখনও বড় একটি চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে প্রযুক্তিনির্ভর ও সহজলভ্য সেবার আওতায় আনতে পারলে সঞ্চয়, বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, ডিজিটাল লেনদেন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হতে পারে। তবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, গ্রাহকের আস্থা বৃদ্ধি, সেবার সহজপ্রাপ্যতা এবং আর্থিক শিক্ষার প্রসারও সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে।

