গ্রাহকদের কাছ থেকে ঋণে উচ্চ সুদ আদায় এবং আমানতে তুলনামূলক কম মুনাফা দেওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান বা ‘স্প্রেড’ সর্বোচ্চ ৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
বর্তমানে দেশের ৬১টি তফসিলভুক্ত ব্যাংকের মধ্যে ৫৫টির স্প্রেড এই সীমার চেয়ে বেশি থাকায় এক মাসের মধ্যে তা নির্ধারিত পর্যায়ে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক সার্কুলারে বলা হয়েছে, ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা ঋণ ছাড়া অন্য সব ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে আমানতের গড় সুদহার এবং ঋণের গড় সুদহারের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ হতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোকে আমানতের সুদহার বৃদ্ধি, ঋণের সুদহার হ্রাস অথবা উভয় ক্ষেত্রেই সমন্বয়ের মাধ্যমে নতুন সীমা বাস্তবায়ন করতে হবে।
ব্যাংকিং খাতে ‘স্প্রেড’ বলতে বোঝায়, একটি ব্যাংক আমানতের বিপরীতে যে গড় সুদ দেয় এবং ঋণের বিপরীতে যে গড় সুদ নেয়—এই দুইয়ের পার্থক্য। সাধারণত এই ব্যবধান থেকেই ব্যাংক পরিচালন ব্যয় মেটানো এবং মুনাফা অর্জন করা হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনেক ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতে ঋণের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মাত্র ছয়টি ব্যাংক ৪ শতাংশের মধ্যে স্প্রেড বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। বাকি ৫৫টি ব্যাংকের স্প্রেড নির্ধারিত সীমার ওপরে রয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছে গেছে, যা ব্যাংকিং খাতে ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদেশি ব্যাংকগুলোর স্প্রেড সবচেয়ে বেশি। দেশে কার্যরত নয়টি বিদেশি ব্যাংকের গড় স্প্রেড ৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের গড় স্প্রেড ৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং বেসরকারি ৪৩টি ব্যাংকের গড় স্প্রেড ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
ব্যাংকভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি স্প্রেড রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে, যা ৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ। দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের স্প্রেড ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ, আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। এছাড়া ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ওরি ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, পদ্মা ব্যাংকসহ আরও অনেক ব্যাংকের স্প্রেড ৫ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বাজারভিত্তিক সুদহার চালুর পর স্প্রেডের ওপর নির্দিষ্ট কোনো সীমা কার্যকর ছিল না। এর ফলে অনেক ব্যাংক আমানতের সুদ না বাড়িয়ে ঋণের সুদ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করে, যা গ্রাহকদের জন্য ঋণ গ্রহণকে ব্যয়বহুল করে তোলে। এই পরিস্থিতি উৎপাদন, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ঋণের উচ্চ সুদের কারণে বিশেষ করে উৎপাদনমুখী শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ছেন। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যাচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, নতুন সীমা কার্যকর করতে ব্যাংকগুলোকে তাদের সুদের কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে হবে। প্রয়োজন হলে আমানতের সুদহার বাড়াতে হবে অথবা ঋণের সুদহার কমিয়ে আনতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্প্রেড কমাতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে হবে। যৌক্তিক কারণ থাকলে সময় বৃদ্ধির আবেদনও বিবেচনা করা হবে।
ব্যাংক খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে তহবিল সংগ্রহের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা ধীরে ধীরে স্প্রেড কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুদহারের ব্যবধান কমানো গেলে ব্যবসা ও শিল্প খাতের জন্য ঋণ গ্রহণ তুলনামূলক সহজ হবে। এতে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে, উৎপাদন সম্প্রসারণ হবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হলে আমানতকারীরাও তুলনামূলক ভালো মুনাফা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
তবে তারা মনে করেন, শুধু স্প্রেড নির্ধারণ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। খেলাপি ঋণ কমানো, পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার মতো কাঠামোগত সংস্কারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব পদক্ষেপ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে ব্যাংকিং খাতে ভারসাম্য ফিরে আসবে এবং গ্রাহক ও অর্থনীতি—উভয়ই দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবে।

