তীব্র তারল্য সংকটের মধ্যেও মাত্র আড়াই শতাংশ সুদে ১০০ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রায় ৪ কোটি টাকা ‘আপ্যায়ন ব্যয়’ দেখিয়েছে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক। এই ব্যয়কে ঘিরে ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ আর্থিক লেনদেন, ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১০০ কোটি টাকার স্পেশাল নোটিশ ডিপোজিট (এসএনডি) সংগ্রহের জন্য এই ব্যয় দেখানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত হিসাব ব্যবহার করে ধাপে ধাপে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে এই টাকা ব্যাংক থেকে বের করা হয়েছে। পরে সেই অর্থ নগদে উত্তোলন করা হয়।
সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অ্যাকাউন্টে প্রথমে ‘প্রণোদনা’ বা ‘ইনসেনটিভ’ হিসেবে বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ জমা দেওয়া হয়। এরপর আগাম স্বাক্ষর নেওয়া চেকের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো অর্থ উত্তোলন করা হয়। কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তারা ব্যবস্থাপনার নির্দেশেই এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বাধ্য হয়েছেন। ভবিষ্যতে কোনো আইনি জটিলতা হলে কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব নেবে বলেও তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল।
অভিযোগের বিষয়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়দুল হক সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বিষয়টি নিয়ে সামনাসামনি আলোচনা করার কথা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন ব্যাংকে আমানত ছড়িয়ে রেখে ঝুঁকি কমানোর উদ্দেশ্যেই এই অর্থ কমার্স ব্যাংকে রাখা হয়েছে। তবে কেন আর্থিকভাবে দুর্বল একটি ব্যাংককে বেছে নেওয়া হলো, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, ব্যবসা উন্নয়ন বা আপ্যায়নের নামে কোনো ধরনের ঘুষ বা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে কমার্স ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংকটি দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া শত শত কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় দণ্ডসুদ গুনতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বিধিবদ্ধ নগদ সংরক্ষণ (সিআরআর) ও তারল্য সংরক্ষণ (এসএলআর) ঘাটতির কারণেও বড় অঙ্কের জরিমানা দিতে হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখা দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে। এতে ব্যাংকের তারল্য সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, আমানত সংগ্রহ বাড়িয়ে তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, আর্থিক সংকটের মধ্যেও একটি আমানত সংগ্রহে এত বড় অঙ্কের ব্যয় দেখানো এবং তা বাস্তবায়নের জন্য কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত হিসাব ব্যবহার করার অভিযোগ ব্যাংকটির সুশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। কারণ, আমানতকারীদের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনআস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও আর্থিক খাতের অন্যান্য বিধিবিধান লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

