দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ কমাতে এবং দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে ‘ডিসট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রস্তাবিত এই আইনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো খেলাপি ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিশেষায়িত সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির কাছে বিক্রির সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে গঠন করা হবে ‘ডিসট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট’ (ডিএএমইউ), যা পুরো কার্যক্রম তদারকি করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জনমত গ্রহণের জন্য আইনটির খসড়া প্রকাশ করেছে। আগামী ১৬ জুলাই পর্যন্ত খসড়ার ওপর মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এরপর প্রয়োজনীয় সংশোধন শেষে আইনটি চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে, নতুন ঋণ বিতরণে সক্ষমতা কমছে এবং প্রকৃত আর্থিক চিত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে আদায় অযোগ্য বা জটিল ঋণ ব্যাংকের হিসাব থেকে আলাদা করে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণই দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা।
আইন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে গঠিত ডিএএমইউ হবে পুরো ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কোন ঋণ সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির কাছে বিক্রি করা যাবে, কোন প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স পাবে এবং কীভাবে পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হবে—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও তদারকি করবে এই ইউনিট।
ডিএএমইউ সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি এবং ঋণসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেবে, তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে, প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করবে এবং প্রয়োজনে বিশেষ টাস্কফোর্সও গঠন করতে পারবে।
প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, ডিএএমইউ প্রশাসনিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে থাকলেও আইন অনুযায়ী নিজস্ব ক্ষমতা প্রয়োগে স্বায়ত্তশাসিত থাকবে।
দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবে। এর মধ্যে রয়েছে বীমা কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড, প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ড, ক্রেডিট ফান্ড, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বিদেশি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি, বহুপাক্ষিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য যোগ্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। তবে ঋণখেলাপি ব্যক্তি বা তাদের নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের জন্য এ ধরনের লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি।
এ ছাড়া পৃথকভাবে ‘লোন সার্ভিসার কোম্পানি’ গঠনেরও সুযোগ থাকবে। এসব প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণের তথ্য সংগ্রহ, সম্পদের মূল্যায়ন, সমঝোতার উদ্যোগ এবং ঋণ পুনরুদ্ধারে পেশাদার সেবা দেবে। তবে আইন অনুযায়ী তারা কোনো ধরনের বেআইনি দখল, জোরপূর্বক উচ্ছেদ বা অবৈধ পদ্ধতিতে ঋণ আদায় করতে পারবে না।
খসড়া আইনে খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা আগের তুলনায় আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। শুধু ঋণগ্রহীতা নয়, তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেও এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
এর মধ্যে ঋণখেলাপির উত্তরাধিকারী, সহযোগী প্রতিষ্ঠান, উল্লেখযোগ্য শেয়ারধারী, বর্তমান বা সাবেক পরিচালক, কর্মকর্তা, প্রধান কর্মচারী, পরিবারের সদস্য, পেশাগত উপদেষ্টা, অর্থদাতা, জামিনদাতা এবং লাভ-ভাগাভাগির চুক্তিতে যুক্ত ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে ঋণ গোপন রাখা বা অন্যের নামে সম্পদ সরিয়ে রাখার সুযোগ সীমিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইন কার্যকর হলে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলো সরাসরি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ কিনতে পারবে। পাশাপাশি তারা সম্পদ সংরক্ষণ, পুনর্গঠন, লিজ, বিক্রি, পুনঃঅর্থায়ন, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন, ব্যবসা আংশিক বা পুরোপুরি বিক্রি এবং প্রয়োজনে ঋণকে শেয়ারে রূপান্তরের মতো পদক্ষেপ নিতে পারবে। এ ছাড়া ঋণ পুনরুদ্ধারের জন্য আদালতে মামলা করা, ট্রাস্ট গঠন এবং প্রয়োজনে ঋণগ্রহীতাকে অতিরিক্ত সময় দেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে।
প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার ডিএএমইউর প্রধান নির্বাহী নিয়োগ দেবে। তার পদমর্যাদা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের সমমানের হবে।
এই পদে নিয়োগ পেতে ব্যাংকিং, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কমপক্ষে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৫ বছর এবং মেয়াদ হবে তিন বছর। আইনের শর্ত ভঙ্গ করলে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি বা লোন সার্ভিসার কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর আর্থিক জরিমানার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
লাইসেন্সের শর্ত না মানলে সর্বনিম্ন ১০ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা জরিমানা করা যাবে। মিথ্যা তথ্য দিয়ে লাইসেন্স নিলে জরিমানার পরিমাণও সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া অনুমোদন ছাড়া শাখা খোলা, কার্যালয় স্থানান্তর, নথি গোপন করা, মিথ্যা তথ্য প্রদান অথবা হিসাবপত্র বিকৃত করলে সংশ্লিষ্ট পরিচালক, প্রধান নির্বাহী, কর্মকর্তা কিংবা দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও পৃথক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের অনেক দেশে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির মাধ্যমে খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বাংলাদেশের মতো দেশে এটি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে আইনের বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা এবং বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর।
তাদের মতে, কেবল নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ঋণ অনুমোদন, তদারকি, জবাবদিহি এবং খেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলেই নতুন আইন কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে।

