বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন গভীর সংকটের মুখে। মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের হারে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান, যা শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, পুরো বিশ্বের মধ্যেই অন্যতম উদ্বেগজনক চিত্র হিসেবে উঠে এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি কেবল ব্যাংক খাতের সমস্যা নয়; বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ধরনের হুমকির ইঙ্গিত বহন করছে।
সর্বশেষ আন্তর্জাতিক তুলনামূলক তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের হারে বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন। দেশটিতে খেলাপি ঋণের হার ৩৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশে এ হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে চাদ, যেখানে খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং গিনিতে ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ।
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমানোর কৌশল নিয়ে আয়োজিত এক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন এবং সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থ বিভাগের সচিব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মাত্র তিন মাসে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ফলে দেশের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায়। মোট ঋণ বিতরণের পরিমাণ ১৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা হওয়ায় খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিসংখ্যান কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত ঋণের চিত্র তুলে ধরে। প্রকৃত ঝুঁকি আরও বড়। কারণ পুনঃতফসিল করা ঋণ এবং বিশেষ পর্যবেক্ষণে থাকা হিসাব যুক্ত করলে ব্যাংক খাতের ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ দেশের মোট ঋণের প্রায় ৬১ শতাংশই এখন কোনো না কোনোভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে আরও বড় অঙ্কের ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও উদ্বেগজনক। ভারতে খেলাপি ঋণের হার মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। ভুটানে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, মালদ্বীপে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, নেপালে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, পাকিস্তানে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ছয় থেকে পনেরো গুণ বেশি।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি পক্ষপাতমূলক ঋণ বিতরণ, দুর্বল নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, কার্যকর তদারকির অভাব এবং ঋণ আদায়ে আইনি জটিলতা খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ অনুমোদনের সময় প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণ ঋণ পরবর্তীতে আদায় করা সম্ভব হয়নি।
আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, তথ্যের অসমতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং করপোরেট সুশাসনের ঘাটতিকে বাংলাদেশের ঋণখাতের প্রধান দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হিসাব-নিকাশে কৃত্রিমতা, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং বারবার ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগও নিয়মিত খেলাপিদের সুবিধা করে দিয়েছে।
খেলাপি ঋণের পাশাপাশি ব্যাংক খাতের মূলধন পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের শেষে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধনের অনুপাত বা সিআরএআর নেমে এসেছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে। এক বছর আগেও যা ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধিমালা অনুযায়ী প্রতিটি ব্যাংকের ন্যূনতম সিআরএআর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে বহু ব্যাংক সেই মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে দেশের ১৯টি ব্যাংক ন্যূনতম মূলধন পর্যাপ্ততার শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এর অর্থ হলো, সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলার মতো পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা এসব ব্যাংকের নেই।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায়ও বাংলাদেশের মূলধন পরিস্থিতি অনেক দুর্বল। পাকিস্তানে সিআরএআর ২০ দশমিক ৮ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ভারতে ১৭ দশমিক ২ শতাংশ। এসব দেশের ব্যাংক খাত তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি মূলধন সুরক্ষিত অবস্থানে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকলে ব্যাংকগুলোকে বিপুল অঙ্কের প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। এতে মুনাফা কমে যায়, পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায় এবং নতুন করে শিল্প, কৃষি কিংবা রপ্তানিমুখী খাতে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা সংকুচিত হয়। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কমে যায় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ব্যাংকের সম্পদের মান খারাপ হলে মূলধনও ক্ষয়ে যায়। এতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থপ্রবাহ কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে বিশ্বের কয়েকটি উন্নত অর্থনীতি শক্তিশালী তদারকি ও কার্যকর ঋণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তাইওয়ানে খেলাপি ঋণের হার মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। বেলজিয়াম, সুইডেন ও এস্তোনিয়ায় এ হার শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। নরওয়েতে ৪ শতাংশেরও কম এবং কানাডায় মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। এসব দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, কঠোর নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছ ঋণ মূল্যায়ন এবং দ্রুত আইনি ব্যবস্থা থাকলে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
ব্যাংক খাতের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রতিবেশী অনেক দেশ ধারাবাহিকভাবে মূলধন সুরক্ষা নিশ্চিত করে তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করেছে। বিপরীতে বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রণহীন খেলাপি ঋণ ও দীর্ঘদিনের প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সাময়িক সুবিধা নয়, বরং গভীর কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ২০২৫ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করা শুরু করেছে। একই সঙ্গে ঋণ শ্রেণীকরণের ক্ষেত্রে বকেয়া থাকার সময়সীমা ছয় মাস থেকে কমিয়ে তিন মাস করায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাস্তবসম্মতভাবে বেড়ে দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া পুনঃতফসিল সুবিধাও অনেক ঋণগ্রহীতা গ্রহণ করেছেন।
ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক ১৮ মাসের একটি সংস্কার কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এর আওতায় বিদ্যমান নিয়মভিত্তিক প্রভিশনিং ব্যবস্থা থেকে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ড অনুযায়ী সম্ভাব্য ঋণ ক্ষতি নির্ধারণ পদ্ধতিতে ধাপে ধাপে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০২৭ সাল থেকে এটি পুরোপুরি কার্যকর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই পদ্ধতিতে ঋণ খেলাপি হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাব করা হবে, ফলে ব্যাংকগুলো আগে থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারবে। বর্তমান ব্যবস্থায় ক্ষতি বাস্তবে ঘটার পর তা হিসাব করা হয়, যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করে।
সংস্কারের অংশ হিসেবে সরকার ঋণসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নতুন ঋণ আদালত আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে ছয় মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের লক্ষ্যে নতুন আইন তৈরির কাজও এগিয়ে চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলোকে তাদের ব্যালান্স শিটে দীর্ঘদিন ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ধরে রাখার পরিবর্তে এর একটি অংশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করতে হবে। এতে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে এবং বারবার ঋণ পুনঃতফসিলের প্রবণতাও কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের অভিমত, কেবল নতুন আইন বা নীতিমালা প্রণয়নই যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ অনুমোদন, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক তদারকি, দ্রুত বিচার, করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা এবং খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া ব্যাংক খাতের সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। অন্যথায় খেলাপি ঋণের এই ঊর্ধ্বগতি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর আরও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

