দেশের ব্যাংক খাত এখন খেলাপি ঋণের ভারে চরম চাপের মুখে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, বন্ধক রাখা সম্পদ বিক্রির জটিলতা এবং ঋণ আদায়ে বছরের পর বছর বিলম্বের কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ‘ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন এই আইনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় একটি আধুনিক কাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করা হবে একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি), যা ব্যাংকের মন্দ ঋণ কিনে পুনরুদ্ধারের কাজ করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ। মামলার নিষ্পত্তি হতে হতে বন্ধক রাখা সম্পদের বাজারমূল্য কমে যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাংকগুলো তাদের পাওনা পুরোপুরি আদায় করতে পারে না। নতুন আইন কার্যকর হলে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ দ্রুত শনাক্ত, ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে। এতে ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে খেলাপি ঋণের চাপ কমবে এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে। ইতোমধ্যে আইনটির খসড়া অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে জনমতের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে।
১৮ মাসে খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্য:
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানান, আগামী ১৮ মাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে মন্দ ঋণ নিষ্পত্তির জন্য এক্সিট পলিসির আওতায় বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে, যা ইউক্রেন ও তুরস্কের মতো কয়েকটি দেশে ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে।
গভর্নরের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন আইন বাস্তবায়িত হলে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ব্যাংকের ব্যালান্স শিট থেকে টক্সিক বা ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ নিজেদের ব্যবস্থাপনায় নিতে পারবে। ২০২৭ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরু করবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে।
তিনি আরও বলেন, বছরের পর বছর মন্দ ঋণ ব্যালান্স শিটে রেখে দেওয়া প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঠিক প্রতিফলন নয়। তাই ব্যাংকগুলোকে রাইট-অফ নীতিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তবে কোনো ঋণ রাইট-অফ করা হলেও ঋণগ্রহীতার দায় শেষ হবে না; আইনি উপায়ে অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
কী থাকছে নতুন আইনে:
খসড়া আইনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে খেলাপি, অবলোপন করা এবং নন-পারফর্মিং ঋণ পুনরুদ্ধার বা বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির জন্য সমন্বিত কোনো আইন নেই। নতুন আইন কার্যকর হলে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে এসব সম্পদ বিক্রি, পুনর্গঠন এবং পুনরুদ্ধারের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট (ডিএএমইউ) গঠন করা হবে। প্রশাসনিকভাবে ইউনিটটি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করবে। এর প্রধানের পদমর্যাদা হবে ডেপুটি গভর্নরের সমান। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাংকিং বা সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অন্তত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং বয়স ৬৫ বছরের বেশি হলে দায়িত্ব পালন করা যাবে না।
খসড়া আইনে এক বা একাধিক ট্রাস্ট গঠনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ব্যাংক থেকে কেনা খেলাপি সম্পদ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির নিজস্ব সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে না; বরং সেগুলো পৃথক ট্রাস্টে সংরক্ষিত থাকবে। ফলে কোম্পানি দেউলিয়া হলেও ট্রাস্টের সম্পদের ওপর পাওনাদারদের দাবি করার সুযোগ থাকবে না।
এ ছাড়া খেলাপি সম্পদ শনাক্ত, তথ্য সংগ্রহ, সম্পদ উদ্ধার এবং আইনি কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে। ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি হিসেবে কাজ করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স নিতে হবে। পাশাপাশি নির্ধারিত মূলধন, দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ এবং ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদের অন্তত ২০ শতাংশ সদস্যকে স্বাধীন পরিচালক হিসেবে রাখতে হবে।
অর্থ পাচার, প্রতারণা বা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা যাবে। তবে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ, শেয়ার ও বন্ড ইস্যু এবং যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হলেও স্বার্থের সংঘাত এড়াতে ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আইনটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা সম্পদ পুনরুদ্ধারের পথ সহজ হবে এবং ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরতে পারে। তবে আদালতের বাইরে সম্পদ বিক্রি, সম্পদের সঠিক মূল্য নির্ধারণ, ঋণগ্রহীতার অধিকার সুরক্ষা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে অপব্যবহারের ঝুঁকিও থেকে যাবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি সফলভাবে কাজ করছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কোনো ব্যাংকের ১০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ৮০ কোটি টাকায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা যেতে পারে। এতে ব্যাংক দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বোঝা কমাতে পারে। পরে কোম্পানি ঋণের পুরো অর্থ আদায় করতে পারলে লাভ করবে, আর ব্যর্থ হলে ক্ষতির দায়ও তাদেরই বহন করতে হবে।
তার মতে, প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি সরকারি না হয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে পরিচালিত হলে কার্যকারিতা আরও বাড়তে পারে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হবে, জবাবদিহি বাড়বে এবং ঋণ পুনরুদ্ধারের সক্ষমতাও উন্নত হবে। তবে এর জন্য শক্তিশালী আইনি কাঠামো ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
ব্যাংকাররাও এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে মনে করছেন। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণের চাপের কারণে দেশের ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়ছে। আদালতকেন্দ্রিক বিদ্যমান ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাওয়া যায়নি। নতুন আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে খেলাপি ঋণ কমবে, ব্যাংক খাতের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে এবং এর ইতিবাচক প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়বে।

