বিশেষ বিশ্লেষণ
একটা সহজ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক। ধরুন, আপনার সামনে দুটো পরিস্থিতি। প্রথমটায় আপনি একটা ব্যাংক থেকে পাঁচ লাখ টাকার একটা ঋণ নিলেন। দ্বিতীয়টায় আপনি পাঁচটা ভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে এক লাখ টাকা করে মোট পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিলেন। মোট অঙ্কটা তো একই, পাঁচ লাখ টাকা। তাহলে ঝুঁকির দিক থেকে দুটো কি একই রকম? বাস্তবতা হলো, দ্বিতীয় পরিস্থিতিটা প্রথমটার চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক হতে পারে, আর এর পেছনে কোনো ধারণা বা অনুমান নয়, বরং বাংলাদেশের প্রকৃত ঋণ-ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত একটা ফাঁকফোকরই দায়ী।
যে সুরক্ষাটা বড় ঋণে থাকে, ছোট ঋণে থাকে না
বাংলাদেশ ব্যাংকের “প্রুডেনশিয়াল রেগুলেশনস ফর কনজ্যুমার ফাইন্যান্সিং”-এ একটা নির্দিষ্ট নির্দেশিকা আছে, যাকে বলে ঋণভার অনুপাত বা ডেট বার্ডেন রেশিও। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যখন কাউকে বড় অঙ্কের ঋণ দেয়, তখন নিয়ম অনুযায়ী তাদের যাচাই করতে হয় যে ঋণগ্রহীতার মাসিক আয়ের কত শতাংশ ইতিমধ্যে অন্যান্য ঋণের কিস্তি পরিশোধেই চলে যাচ্ছে। এই যাচাইয়ের জন্য ব্যাংক ব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো বা সিআইবি-র তথ্যভাণ্ডার, যেখানে দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা প্রতিটি ঋণগ্রহীতার তথ্য জমা থাকে। অর্থাৎ একজন মানুষ যদি একটা ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে যান, আর তার আগে থেকেই অন্য কোনো ব্যাংকে বড় দেনা থাকে, সেটা সিআইবি চেক করলেই ধরা পড়ে যায়। নতুন ঋণ অনুমোদনের আগেই সতর্ক-সংকেত বেজে ওঠে।
কিন্তু ছোট ঋণগুলো এই নেটওয়ার্কের বাইরে থেকে যায়
সমস্যাটা তৈরি হয় ঠিক এখানেই। বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালিত হয় মূলত মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি বা এমআরএ-র লাইসেন্সপ্রাপ্ত এনজিও-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে, যেগুলো ২০০৬ সালের এমআরএ আইনের অধীনে নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু এই ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো ঐতিহাসিকভাবে ব্যাংকের সিআইবি নেটওয়ার্কের বাইরে থেকে গেছে। সাম্প্রতিক একটা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ, সমবায়ভিত্তিক ঋণ, মহাজনি বা খুচরা ব্যবসায়ী-ঋণ এবং ডিজিটাল ঋণের মতো ব্যবস্থাগুলো এখনো বড় অংশেই সিআইবির আওতার বাইরে। এমআরএ নিজস্বভাবে একটা জাতীয় তথ্যভাণ্ডার (এমএফআই-ডিবিএমএস) রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে সমন্বিত একটা পৃথক “এমএফ-সিআইবি” তৈরির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকও সই হয়েছে, কিন্তু ব্যবস্থাটা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর নয়। এর ফলে একজন মানুষ চাইলেই একইসঙ্গে পাঁচ-ছয়টা ভিন্ন এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা আলাদা ঋণ নিতে পারেন, আর কোনো একটা প্রতিষ্ঠানই জানতে পারে না যে তিনি ইতিমধ্যে আর কতগুলো জায়গায় ঋণী।
এই সমস্যাটা কল্পনাপ্রসূত নয়, গবেষণায় প্রমাণিত
বিশ্বব্যাংকের একটা বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একই ব্যক্তির একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা এবং তার ফলে সৃষ্ট “ওভারল্যাপিং ডেট” বা পরস্পর-জড়ানো দেনার সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। এই উদ্বেগের প্রেক্ষাপটেই ২০০৬ সালে এমআরএ প্রতিষ্ঠা করে সরকার ক্ষুদ্রঋণ খাতে লাইসেন্সিং বাধ্যতামূলক করে এবং ২০১১ সালে ক্ষুদ্রঋণের সুদহারের ওপর সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশের সীমা বেঁধে দেয়, ঠিক এই ধরনের অতিরিক্ত ঋণ-বোঝা ঠেকাতেই। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নিজেরাই স্বীকার করে নিয়েছে যে সমস্যাটা বাস্তব এবং দীর্ঘদিনের।
আমার নিজের পর্যবেক্ষণ: কেন সংখ্যাটা নয়, কাঠামোটাই আসল সমস্যা
এই পুরো চিত্রটা একসঙ্গে সাজালে আমার নিজের বিশ্লেষণী সিদ্ধান্ত হলো, একাধিক ছোট ঋণ বিপজ্জনক হওয়ার কারণ নিছক অঙ্কের বড়-ছোট নয়, বরং তদারকির কাঠামোগত শূন্যতা। একটা বড় ব্যাংক-ঋণে ধার করা টাকার পুরো চিত্রটা একজায়গায় দৃশ্যমান থাকে, আর ডিবিআর নীতির কারণে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান নিজের স্বার্থেই ঋণগ্রহীতার সামর্থ্যের সীমা যাচাই করে নেয়। এটা অনেকটা একজন ডাক্তারের মতো, যিনি রোগীর পুরো মেডিকেল হিস্ট্রি দেখে ওষুধ ঠিক করেন। কিন্তু একাধিক ছোট ঋণের ক্ষেত্রে প্রতিটা “ডাক্তার” শুধু নিজের দেওয়া ওষুধটুকুই দেখেন, রোগী আগে থেকে আর কী কী ওষুধ খাচ্ছেন তা জানেন না; ফলে প্রতিটা ঋণ আলাদাভাবে “নিরাপদ” মনে হলেও, একসঙ্গে যোগ করলে সেটা ঋণগ্রহীতার প্রকৃত পরিশোধ-সামর্থ্যকে ছাড়িয়ে যেতে পারে, অথচ কেউ সেটা আগেভাগে ধরতে পারে না। এর সঙ্গে যোগ হয় আরেকটা বাস্তব সমস্যা; প্রতিটা আলাদা ঋণের নিজস্ব প্রসেসিং ফি, সঞ্চয় জমার শর্ত বা সাপ্তাহিক কিস্তির সময়সূচি থাকে, ফলে পাঁচটা ছোট ঋণ সামলাতে গিয়ে একজন মানুষকে পাঁচটা ভিন্ন সময়সূচি, পাঁচটা ভিন্ন শর্ত আর পাঁচগুণ প্রশাসনিক চাপ একসঙ্গে সামলাতে হয়, যেখানে একটা বড় ঋণে থাকে একটামাত্র সুনির্দিষ্ট মাসিক কিস্তি।
তাহলে সমাধান কোথায়
এই সমস্যার সবচেয়ে বড় সমাধান হলো ঠিক সেই কাজটাই, যেটা বাংলাদেশ ব্যাংক ও এমআরএ যৌথভাবে করার চেষ্টা করছে। ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান, ডিজিটাল ঋণদাতা; সবাইকে একটা অভিন্ন ক্রেডিট তথ্যভাণ্ডারের আওতায় আনা, যাতে যেকোনো নতুন ঋণ অনুমোদনের আগে ঋণগ্রহীতার সামগ্রিক দেনার প্রকৃত চিত্র সবার কাছে দৃশ্যমান থাকে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিক বেসরকারি ক্রেডিট ব্যুরোকে লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে টেলিকম, ইউটিলিটি ও খুচরা ব্যবসার তথ্যও যুক্ত করে ঋণগ্রহীতাদের একটা পূর্ণাঙ্গ ক্রেডিট প্রোফাইল তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কিন্তু এই কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত দায়িত্বটা অনেকাংশে ঋণগ্রহীতার নিজের ওপরই থেকে যায়। নতুন কোনো ছোট ঋণ নেওয়ার আগে নিজের হাতে থাকা সবগুলো ঋণের মোট কিস্তি যোগ করে দেখে নেওয়া, আর মনে রাখা যে “প্রতিটা ঋণ আলাদাভাবে ছোট” মানেই এই নয় যে সবগুলো মিলিয়ে বোঝাটাও ছোট থাকবে।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

