দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে আমানত প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য গতি এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গ্রাহকদের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিং সেবার প্রতি আগ্রহ বাড়ায় পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের পাশাপাশি প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং শাখা ও উইন্ডোতেও আমানত বেড়েছে। ফলে এক বছরের ব্যবধানে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মোট আমানত ৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকা। এক বছর আগে একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে আমানত বেড়েছে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আগের বছরের একই সময়ে এই প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। ফলে চলতি বছরের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় দশ গুণেরও বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, শুধু পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক নয়, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামী ব্যাংকিং শাখা ও উইন্ডোও আমানত সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এতে ইসলামী ব্যাংকিং সেবার বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বেড়েছে এবং গ্রাহকদের জন্য বিকল্প সেবার সুযোগও সম্প্রসারিত হয়েছে।
তবে আমানত বাড়লেও দেশের মোট ব্যাংকিং খাতের আমানতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশ কিছুটা কমেছে। মার্চ শেষে দেশের মোট ব্যাংক আমানতের ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ ছিল ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার দখলে, যেখানে এক বছর আগে এ হার ছিল ২৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতেও আমানত বাড়ায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর আপেক্ষিক অংশীদারিত্ব সামান্য কমেছে।
পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমানত রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে। মোট ইসলামী ব্যাংকিং আমানতের ৩৮ দশমিক ৩৫ শতাংশই রয়েছে ব্যাংকটির দখলে। এর পর রয়েছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, এক্সিম ব্যাংক পিএলসি এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি।
আমানতের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট আমানতের সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে মুদারাবা মেয়াদি আমানত থেকে, যার অংশ ৫১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মুদারাবা সঞ্চয়ী আমানত, যার অংশ ১৯ দশমিক ২৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই চিত্র থেকে বোঝা যায় গ্রাহকদের একটি বড় অংশ তুলনামূলক বেশি মুনাফার আশায় মেয়াদি আমানতের প্রতি ঝুঁকছেন। দীর্ঘমেয়াদি মুনাফাভিত্তিক আমানতের ওপর নির্ভরতা ব্যাংকগুলোর অর্থায়নের ভিত্তিকে স্থিতিশীল করতে সহায়তা করলেও তারল্য সংকট দেখা দিলে বড় অঙ্কের অর্থ উত্তোলনের চাপও সৃষ্টি হতে পারে।
অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বা ঋণ বিতরণও বেড়েছে। মার্চ শেষে এ খাতে মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেশি। এক বছরে বিনিয়োগ বেড়েছে ২৪ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণ ও অগ্রিমের ২৯ দশমিক ৯ শতাংশই এসেছে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় অংশীদার ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, যার বাজার অংশীদারিত্ব ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ। এরপর রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এবং এক্সিম ব্যাংক পিএলসি। এতে বোঝা যায়, ইসলামী ব্যাংকিং খাতের অর্থায়নের বড় অংশ এখনো কয়েকটি বড় ব্যাংকের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত।
খাতভিত্তিক বিনিয়োগ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইসলামী ব্যাংকগুলোর অর্থায়নের সবচেয়ে বড় অংশ গেছে বৃহৎ শিল্প খাতে। মোট বিনিয়োগের ৩৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ এই খাতে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাণিজ্য ও ব্যবসা খাত, যেখানে গেছে ৩৩ দশমিক ১২ শতাংশ অর্থায়ন।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ইসলামী ব্যাংকগুলো এখনো ক্ষুদ্র, কুটির, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের তুলনায় শিল্প ও বাণিজ্য খাতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে প্রকৃত মুনাফা-লোকসান অংশীদারিত্বভিত্তিক অর্থায়ন পদ্ধতি, যেমন মুশারাকা ও মুদারাবার ব্যবহার এখনো খুবই সীমিত।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুপারিশ করেছে, ইসলামী ব্যাংকগুলোকে মুশারাকা ও মুদারাবাভিত্তিক অর্থায়নে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি নতুন ও উদ্ভাবনী আর্থিক পণ্য চালুর মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকগুলো শুধু আমানত ও বিনিয়োগেই নয়, প্রবাসী আয় সংগ্রহ, কৃষিঋণ, সবুজ অর্থায়ন, ক্ষুদ্রঋণ এবং নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভবিষ্যতে গ্রামীণ এলাকায় সেবা সম্প্রসারণ, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান, নারী উদ্যোক্তা ও সরকারি সংস্থার আর্থিক চাহিদা পূরণে আরও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সেবার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামী ব্যাংকিং শাখার সম্প্রসারণও এ খাতের প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করছে। তবে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সুশাসন, শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়নের মৌলিক নীতির যথাযথ বাস্তবায়ন এবং নতুন গ্রাহকভিত্তি তৈরি করাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

