বাংলাদেশের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এক সময় দেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণশীল অংশ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুশাসনের সংকট, ব্যাপক ঋণ অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, খেলাপি ঋণের বিস্তার এবং ব্যবস্থাপনায় অস্থিরতার কারণে সেই আস্থার ভিত্তি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
ফলে একদিকে কমছে বাজারে অংশীদারিত্ব, অন্যদিকে দুর্বল হয়ে পড়ছে রেমিট্যান্স সংগ্রহ, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং নতুন বিনিয়োগ সক্ষমতা। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিক সংস্কার, সুশাসন এবং দ্রুত পুনর্গঠন সম্ভব হলে এই খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতের মোট আমানতের ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ রয়েছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায়। চার বছর আগেও এই অংশ ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ। একই সময়ে বৈদেশিক লেনদেন ও রেমিট্যান্স সংগ্রহেও ইসলামী ব্যাংকগুলোর অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। ২০২৩ সালে মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৫৫ শতাংশ এসব ব্যাংকের মাধ্যমে এলেও বর্তমানে সেই অংশ নেমে এসেছে প্রায় ২০ শতাংশে।
শুধু বাজার অংশীদারিত্ব নয়, দীর্ঘ সময় পর প্রথমবারের মতো ইসলামী ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণও কমেছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এ খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৮১ হাজার ১৯২ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকায়। দেশে আশির দশকে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম চালুর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে আমানত বাড়লেও এবার সেই প্রবণতায় ব্যতিক্রম দেখা গেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এর প্রধান কারণ গ্রাহকদের মধ্যে তৈরি হওয়া আস্থাহীনতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকে বড় অঙ্কের অনিয়ম, বেনামি ঋণ বিতরণ এবং অর্থ আত্মসাতের ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় অনেক গ্রাহক নতুন করে অর্থ জমা রাখতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন। আবার অনেকেই নিরাপদ বিকল্প খুঁজছেন। তবে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক সেবা অনুসরণকারী গ্রাহকদের বড় একটি অংশ সুদভিত্তিক ব্যাংকে যেতে চান না। ফলে তাঁদের কেউ কেউ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরেও চলে যাচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বিষয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আগ্রহ এখনো অটুট রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো ২৭৩ দিন মেয়াদি ইজারা সুকুক বন্ডের নিলাম আয়োজন করলে ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ৫৬ হাজার ৬০৭ কোটি টাকার। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার ১০ গুণেরও বেশি চাহিদা তৈরি হয়।
সাবেক অর্থসচিব ও সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর মতে, এই বিপুল সাড়া প্রমাণ করে দেশের মানুষের একটি বড় অংশ এখনো শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখেন। তাঁর ভাষ্য, সমস্যাটি ইসলামী ব্যাংকিং ধারণার নয়, বরং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের। তাই সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে দ্রুত কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
বাংলাদেশে ১৯৮৩ সালে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তী কয়েক দশকে এই খাতের অর্থায়নে অসংখ্য ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ উদ্যোক্তা গড়ে ওঠেন। অনেক প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক অনিয়ম ও আর্থিক সংকট সেই অগ্রযাত্রাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
বর্তমানে দেশের ১০টি পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের মধ্যে বেশ কয়েকটি গভীর আর্থিক সংকটে রয়েছে। সুশাসনের অভাব, বেনামি ঋণ, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে অন্তত সাতটি ব্যাংক কার্যত বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। অনেক ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পেরে বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে নতুন ঋণ বা বিনিয়োগ কার্যক্রমও প্রায় স্থবির হয়ে আছে।
এর ফলে শুধু ব্যাংক নয়, শিল্প ও ব্যবসা খাতও প্রভাবিত হচ্ছে। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের অর্থায়নে গড়ে ওঠা অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় চলতি মূলধন পাচ্ছে না। কোথাও উৎপাদন কমেছে, কোথাও আবার কারখানা বন্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। নতুন উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মোট বিনিয়োগ বা ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ২৬ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা, যা দেশের মোট ব্যাংক ঋণের প্রায় ২৯ দশমিক ১০ শতাংশ। অর্থাৎ আমানতের তুলনায় ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। কিন্তু বিতরণ করা ঋণের বড় অংশ খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় নতুন অর্থায়নের সক্ষমতা কমে গেছে।
বিশেষ নিরীক্ষায় উঠে এসেছে, কয়েকটি ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে বের করে নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা কয়েকটি ব্যাংকে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষা অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি থেকে নামে-বেনামে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
এই সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক—একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে নতুন ব্যাংকটির কার্যক্রম এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮৪ শতাংশেরও বেশি।
এদিকে দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন ও চেয়ারম্যান নিয়োগকে ঘিরে অস্থিরতা তৈরি হয়। এর প্রভাবে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত তুলে নেওয়া হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা নিতে হয়েছে।
তবে ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন জানিয়েছেন, বর্তমানে লেনদেন স্বাভাবিক হচ্ছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা ছাড়াই নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছে। অনেক গ্রাহক আবার নতুন করে আমানতও জমা রাখছেন। তাঁর আশা, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম চালু হলে পুরো খাতেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের ১ হাজার ৭০০টি শাখা রয়েছে। পাশাপাশি ১৭টি প্রচলিত ব্যাংকের ৪৯টি ইসলামী ব্যাংকিং শাখা এবং ২১টি ব্যাংকের ৯৭৬টি ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডোর মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক সেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে এসব শাখা ও উইন্ডোতেও চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে আমানত কিছুটা কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্সের অর্থনীতি ও ইসলামিক ফাইন্যান্স গবেষক অধ্যাপক এম কবির হাসান মনে করেন, বাংলাদেশের জনগণের বড় একটি অংশ এখনো শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে থাকতে চান। তাই এই খাতকে দুর্বল রেখে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর মতে, বাস্তবভিত্তিক সংস্কার, সুশাসন এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে ইসলামী ব্যাংকিং খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।
বিশ্বব্যাপীও ইসলামী অর্থব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৯ সালের পর থেকে ইসলামিক ফাইন্যান্স খাত গড়ে বছরে প্রায় ১৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২২ সালের শেষে বৈশ্বিক ইসলামিক ফাইন্যান্স খাতের সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৮ সালের মধ্যে তা ৭ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুধু ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সম্পদের পরিমাণই ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে মুসলিমপ্রধান দেশের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, চীন, হংকং, থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশেও ইসলামিক ফাইন্যান্স দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ চলছে। একই সঙ্গে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির অবস্থারও উন্নতি হচ্ছে বলে তিনি জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সংকট কেবল কয়েকটি ব্যাংকের সমস্যা নয়; এটি দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই দ্রুত সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন এই খাত পুনরুজ্জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

