বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, আস্থার সংকট এবং সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে কয়েকটি বড় ব্যাংকে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ এবং তারল্য সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে আমানতকারীদের অর্থ কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হবে, সে প্রশ্ন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এমন বাস্তবতায় দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংকট সমাধানে সরকারকে সরাসরি এগিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও কাজী ফার্মস গ্রুপের অন্যতম উদ্যোক্তা কাজী জাহিন হাসান।
একটি মতামতধর্মী নিবন্ধে তিনি বলেন, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে অন্য সুস্থ ব্যাংকের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সরকারকেই উদ্ধার তহবিল গঠন করে সরাসরি দায়িত্ব নিতে হবে। অন্যথায় ব্যাংক খাতে আস্থাহীনতা আরও বাড়বে এবং বড় ধরনের ব্যাংক দৌড় বা ‘ব্যাংক রান’-এর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংকে চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। এর জেরে অল্প কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বিপুল পরিমাণ আমানত তুলে নেওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট হয়ে গেলে কোনো ব্যাংকের পক্ষে দীর্ঘ সময় টিকে থাকা সম্ভব নয়, কারণ পৃথিবীর কোনো ব্যাংকই একসঙ্গে সব আমানতকারীর অর্থ পরিশোধ করার মতো নগদ অর্থ হাতে রাখে না।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, ব্যাংক মূলত আমানতকারীদের অর্থ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের ঋণ হিসেবে বিতরণ করে। ফলে হঠাৎ করে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক একযোগে টাকা তুলে নিতে শুরু করলে ব্যাংকের তারল্য সংকট দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিই ব্যাংক দৌড়ে রূপ নেয়, যা অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে।
নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের তথ্য অনুযায়ী ইসলামী ব্যাংককে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে, যা ব্যাংকটিতে সম্ভাব্য বড় ধরনের সংকট এড়াতে সহায়তা করেছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে তাঁর মতে, এটি কেবল সাময়িক সমাধান। মূল সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। তিনি দাবি করেন, ইসলামী ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে এবং ব্যাংকটি কার্যত দেউলিয়া অবস্থার দিকে চলে গেছে।
তিনি আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংক একা নয়; বিগত সরকারের সময় প্রভাবশালী কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে বিপুল অঙ্কের ঋণ দিয়েছে। পরে অতিমূল্যায়িত আমদানির মাধ্যমে অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ঋণ পরিশোধ না করেই অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। এর ফলে কয়েকটি ব্যাংকের মূলধন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সুস্থ ব্যাংকগুলোকে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক অধিগ্রহণে বাধ্য করার নীতির সমালোচনা করে কাজী জাহিন হাসান বলেন, একটি সুস্থ ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব তার নিজস্ব আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাই সরকারি শতভাগ নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো সুস্থ ব্যাংকের পক্ষে দেউলিয়া ব্যাংকের দায় নেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়।
তিনি প্রস্তাব দেন, সরকার ট্রেজারি বন্ড বা সরকারি বন্ড বিক্রির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করে সেই অর্থ ঋণ হিসেবে নয়, বরং মূলধন হিসেবে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকে বিনিয়োগ করতে পারে। এতে সরকার ওই ব্যাংকগুলোর প্রধান মালিক হয়ে যাবে এবং কার্যত সেগুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চলে আসবে।
তাঁর ভাষায়, রাষ্ট্রীয় মালিকানায় গেলে আমানতকারীদের মধ্যে নতুন করে আস্থা তৈরি হবে। কারণ সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেন, প্রয়োজন হলে সরকার বন্ড বিক্রি করে হলেও রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে সক্ষম।
উদাহরণ হিসেবে তিনি জনতা ব্যাংকের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ব্যাংকটিরও বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ রয়েছে। কিন্তু এটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হওয়ায় আমানতকারীদের মধ্যে তেমন আতঙ্ক দেখা যায় না।
ব্যাংক খাতের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই অঙ্ক কতটা বড়, তা বোঝাতে তিনি পদ্মা সেতুর নির্মাণ ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর হিসাবে, এই অর্থ দিয়ে প্রায় ১৯টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব।
তবে সরকার যদি প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকার বন্ড বিক্রি করে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার করে, তাহলে তারও অর্থনৈতিক প্রভাব থাকবে বলে সতর্ক করেন তিনি। কারণ ব্যাংকগুলো সরকারি বন্ড কিনলে বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাবে। এতে শিল্প ও ব্যবসায় বিনিয়োগ কমতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে।
তারপরও তিনি মনে করেন, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বন্ধ করে দেওয়ার ঝুঁকি আরও বড়। কারণ একটি বড় ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণ মানুষ পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাতে পারেন। তখন সুস্থ ব্যাংক থেকেও ব্যাপক হারে আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা শুরু হতে পারে, যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।
তিনি বলেন, কোনো ব্যাংক বন্ধ করতে হলে তার আগে অবশ্যই আমানতকারীদের অর্থ নিরাপদে ফেরত দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। সরকার যদি প্রকাশ্যে এই নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে ব্যাংক দৌড়ের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।
নিবন্ধে আরও বলা হয়, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হলে তারা আবার নগদ অর্থ, স্বর্ণ কিংবা জমিজমায় সঞ্চয় করতে শুরু করবে। এতে ব্যাংকগুলো আমানত হারাবে, ঋণ বিতরণ কমে যাবে এবং উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তবে তিনি মনে করেন, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার পর প্রয়োজন হলে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলো বন্ধও করে দেওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ব্যাংকের অবশিষ্ট সম্পদ, ঋণ ও বন্ধকী সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কোনো ব্যাংক বা পৃথক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা যেতে পারে। খেলাপিদের বন্ধকী সম্পদ বিক্রি করে ধীরে ধীরে ক্ষতির একটি অংশও পুনরুদ্ধার সম্ভব।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বড় ঋণখেলাপি ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা নিষ্পত্তি এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। বিশেষ করে অভিযুক্তরা যদি বিদেশে অবস্থান করেন, তাহলে আইনি প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং কার্যকর পুনর্গঠনই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সরকার কী ধরনের নীতি গ্রহণ করবে, তা আগামী মাসগুলোতে দেশের আর্থিক খাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (মতামত)

