Close Menu
Citizens VoiceCitizens Voice
    Facebook X (Twitter) Instagram YouTube LinkedIn WhatsApp Telegram
    Citizens VoiceCitizens Voice মঙ্গল, আগস্ট 11, 2026
    • প্রথমপাতা
    • অর্থনীতি
    • বাণিজ্য
    • ব্যাংক
    • পুঁজিবাজার
    • বিমা
    • কর্পোরেট
    • বাংলাদেশ
    • আন্তর্জাতিক
    • আইন
    • অপরাধ
    • মতামত
    • অন্যান্য
      • খেলা
      • শিক্ষা
      • স্বাস্থ্য
      • প্রযুক্তি
      • ধর্ম
      • বিনোদন
      • সাহিত্য
      • বিশ্ব অর্থনীতি
      • ভূ-রাজনীতি
      • বিশ্লেষণ
      • ভিডিও
    Citizens VoiceCitizens Voice
    Home » স্বার্থের আড়ালে ব্যাংক থেকে গোপনে নিজের লোকজনকে তহবিল দেওয়া  কি সুস্থ ব্যাংকিং?
    সম্পাদকীয়

    স্বার্থের আড়ালে ব্যাংক থেকে গোপনে নিজের লোকজনকে তহবিল দেওয়া  কি সুস্থ ব্যাংকিং?

    নিউজ ডেস্কআগস্ট 10, 2026
    Facebook Twitter Email Telegram WhatsApp Copy Link
    Share
    Facebook Twitter LinkedIn Telegram WhatsApp Email Copy Link

    ব্যাংকের টাকা ব্যক্তির নয়, প্রতিষ্ঠানেরও নয়—এটি মূলত আমানতকারীদের অর্থ। সেই অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয়ে শিল্প, ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াবে—এটাই একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রত্যাশা। কিন্তু কোনো ব্যাংকের পরিচালক, প্রভাবশালী শেয়ারহোল্ডার, ব্যবস্থাপনা বা তাঁদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ যখন ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তখন ব্যাংকের অর্থ ব্যবহারের পুরো প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

    সমস্যাটি আরও জটিল হয় যখন সুবিধা নেওয়া হয় সরাসরি নিজের নামে নয়, বরং পরিবারের সদস্য, সহযোগী ব্যবসা, নিয়ন্ত্রিত কোম্পানি, নামমাত্র মালিক বা একাধিক প্রতিষ্ঠানের জটিল মালিকানা কাঠামোর মাধ্যমে। কাগজে ঋণগ্রহীতা আলাদা হলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ যদি একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে থাকে, তাহলে সেই ঋণকে স্বাধীন ব্যবসায়িক লেনদেন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তাই শুধু ঋণগ্রহীতার নাম জানাই যথেষ্ট নয়; জানতে হবে অর্থের প্রকৃত সুবিধাভোগী কে এবং সিদ্ধান্তের পেছনে কার প্রভাব রয়েছে।

    বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতি এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ সালের Monetary Policy Review অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬-এ ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ ছিল খেলাপি ঋণ। মার্চ ২০২৫-এ এই হার ছিল ২৪.১৩ শতাংশ। এর আগে সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ তা রেকর্ড ৩৫.৭৩ শতাংশে উঠেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ঋণ, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কঠোর ঋণ শ্রেণীকরণ, ঋণগ্রহীতাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ এবং ব্যাংকিং গভর্ন্যান্সের কাঠামোগত দুর্বলতা খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে। এই বাস্তবতা দেখিয়ে দিচ্ছে, ব্যাংকের অর্থ কোথায় যাচ্ছে—তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, কার স্বার্থে যাচ্ছে।

    স্বার্থের সংঘাত তখনই তৈরি হয়, যখন ব্যাংকের কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির নিজের বা ঘনিষ্ঠ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লাভের সম্ভাবনা থাকে। একজন পরিচালক যদি এমন একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ অনুমোদনের আলোচনায় প্রভাব ফেলেন, যার সঙ্গে তাঁর সরাসরি বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে, তাহলে ব্যাংকের স্বার্থ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ এক জায়গায় থাকে না।

    এ ধরনের পরিস্থিতিতে ঋণের পরিমাণ বেশি হওয়াই একমাত্র সমস্যা নয়। বরং ঋণটি কী শর্তে দেওয়া হয়েছে, জামানতের মূল্য কতটা বাস্তবসম্মত, ব্যবসার cash flow যথেষ্ট কি না, অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার হয়েছে কি না এবং ঋণগ্রহীতার সঙ্গে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত সম্পর্ক কী—এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

    একজন সাধারণ উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে ব্যাংক যেখানে ব্যবসার আয়, নগদ প্রবাহ, জামানত, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও বাজার পরিস্থিতি যাচাই করে, সেখানে প্রভাবশালী বা সম্পর্কিত ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড শিথিল হলে ব্যাংকের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ে। আরও বিপজ্জনক হলো, এমন ঋণ শুরুতে ভালো দেখালেও কয়েক বছর পর খেলাপি হয়ে ব্যাংকের বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।

    বর্তমান সময়ে আর্থিক অনিয়মের ধরনও বদলেছে। সরাসরি নিজের নামে ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে একাধিক কোম্পানি, অংশীদার, আত্মীয়স্বজন কিংবা nominee-এর মাধ্যমে মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। ফলে একটি প্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে পরীক্ষা করলে তার সঙ্গে ব্যাংকের কোনো পরিচালকের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া নাও যেতে পারে। কিন্তু সব প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও লেনদেন একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

    এ কারণেই ব্যাংকিং ব্যবস্থা UBO শনাক্তকরণ গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি কাগজে প্রতিষ্ঠানের মালিক নন, কিন্তু বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটির সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করেন কিংবা আর্থিক সুবিধার চূড়ান্ত প্রাপক, তাঁকে শনাক্ত না করা গেলে related-party lending ঠেকানো কঠিন। ব্যাংকের প্রকৃত মালিকানা ও ownership structure সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ ও যাচাইয়ের ব্যবস্থা তাই শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। সরাসরি ও পরোক্ষ মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ এবং পারস্পরিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হবে।

    স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেনের ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের ৮ই মে মাসে ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনের বিষয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করে। এতে bank-related persons or institutions এবং তাঁদের related persons or institutions-কে দেওয়া ব্যাংকের মোট credit facilities-এর সীমা ব্যাংকের Tier-1 capital-এর ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। সীমা লঙ্ঘিত হলে ব্যাংককে তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে exposure সীমার মধ্যে আনার কর্মপরিকল্পনা দিতে হবে।

    শুধু সীমা নির্ধারণ করাই নয়, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেনে সাধারণ গ্রাহকের তুলনায় বেশি সুবিধা দেওয়ার পথও বন্ধ করা হয়েছে। সুদের হার, কমিশন, ফি, চার্জ, মেয়াদ, কিস্তির কাঠামো এবং জামানতের ধরন, মান ও পরিমাণ—সব ক্ষেত্রেই লেনদেনকে ব্যাংকের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে এবং অসংশ্লিষ্ট গ্রাহকের তুলনায় বেশি সুবিধাজনক হওয়া যাবে না।এটি ব্যাংকিং খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রতিষ্ঠা করে: সম্পর্কের কারণে কেউ ব্যাংকের কাছ থেকে বাড়তি সুবিধা পেতে পারবেন না। তবে নিয়ম যতই কঠোর হোক, প্রকৃত সম্পর্ক শনাক্ত করা না গেলে তার প্রয়োগ দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো বিধানকে বাস্তব তদারকির সঙ্গে যুক্ত করা।

    ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কাঠামো। তাই কোনো পরিচালক যদি নিজের, পরিবারের সদস্যের বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ নিয়ে সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেন, তাহলে সেটি শুধু স্বার্থের সংঘাত নয়; করপোরেট গভর্ন্যান্সের মৌলিক নীতিরও ব্যত্যয়।

    আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট পরিচালককে শুধু ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখলেই দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়। ঋণের appraisal, processing, approval ও monitoring—প্রতিটি ধাপেই তাঁর প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থা থাকা দরকার। কারণ ঋণের অনিয়ম অনেক সময় অনুমোদনের মুহূর্তে দৃশ্যমান হয় না। অনুমোদনের পর ঋণের টাকা অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর, সম্পদ কেনা, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে অর্থ দেওয়া কিংবা ব্যবসার বাইরে ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকৃত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

    ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সময় যে উদ্দেশ্য দেখানো হয়, বাস্তবে অর্থটি সেই কাজে ব্যবহার হচ্ছে কি না—এটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য নেওয়া অর্থ যদি অন্য কোম্পানিতে চলে যায়, অথবা ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিবর্তে জমি, শেয়ার কিংবা ব্যক্তিগত সম্পদ কেনায় ব্যবহৃত হয়, তাহলে ব্যাংকের অর্থ উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে না।

    তাই বড় ঋণের ক্ষেত্রে শুধু কাগজপত্র যাচাই করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। ঋণ ছাড়ের পরও ব্যাংককে দেখতে হবে ব্যবসার বিক্রয়, নগদ প্রবাহ, আমদানি-রপ্তানি, কর পরিশোধ, ব্যাংক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অর্থ স্থানান্তরের ধরন। প্রযুক্তির সাহায্যে এসব তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করা সম্ভব। একই সঙ্গে একই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর একাধিক প্রতিষ্ঠানে ঋণ থাকলে আলাদাভাবে নয়, সামগ্রিক exposure হিসাব করতে হবে। নইলে একটি গোষ্ঠীর প্রকৃত ঋণঝুঁকি কাগজে ছোট দেখালেও বাস্তবে তা বিপুল হতে পারে।

    বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকটকে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ঋণের আলোচনার বাইরে রাখা যায় না। মার্চ ২০২৬-এ gross NPL ratio ৩২.২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে এই পুরো খেলাপি ঋণকে স্বার্থের সংঘাত বা অনিয়মের ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ব্যবসায়িক মন্দা, মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদ, বাজারের সংকোচন কিংবা প্রকৃত ব্যবসায়িক ব্যর্থতার কারণেও ঋণ খেলাপি হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণেও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ঋণ ও ব্যাংকিং গভর্ন্যান্সের দুর্বলতাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

    কিন্তু যখন বড় অঙ্কের ঋণ একই ব্যক্তি, পরিবার বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয় এবং পরবর্তীতে সেই ঋণের বড় অংশ অনুৎপাদনশীল বা খেলাপি হয়ে পড়ে, তখন সংশ্লিষ্টতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা অপরিহার্য।

    ব্যাংকিং তদারকির পুরোনো পদ্ধতিতে কর্মকর্তারা মূলত নথি দেখে ঋণগ্রহীতার তথ্য যাচাই করেন। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এর সঙ্গে data analytics যুক্ত করা প্রয়োজন। একই ঠিকানা, ফোন নম্বর, পরিচালক, মালিকানা, গ্যারান্টর, জামানত বা অর্থ স্থানান্তরের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে একটি digital system সহজেই বুঝতে পারে কয়েকটি আলাদা কোম্পানি বাস্তবে একই ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের অংশ কি না।

    কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অস্বাভাবিক হারে অর্থ স্থানান্তর, একই সম্পদ বারবার জামানত হিসেবে দেখানো, স্বল্প সময়ের মধ্যে একাধিক ঋণ গ্রহণ কিংবা ঋণের অর্থ দ্রুত অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়া—এসবকে early-warning signal হিসেবে শনাক্ত করা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকিতে CIB, কোম্পানি মালিকানা, করসংক্রান্ত তথ্য এবং ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্যের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে এই ব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে।

    ব্যাংকের হিসাবপত্রে কোনো ঋণ ভালো দেখালেই সেটি প্রকৃত অর্থে ভালো ঋণ—এমন নিশ্চয়তা নেই। এ কারণেই Asset Quality Review বা AQR গুরুত্বপূর্ণ। ঋণের প্রকৃত মান, জামানতের বাস্তব মূল্য, ঋণের ব্যবহার এবং repayment capacity যাচাইয়ের মাধ্যমে ব্যাংকের লুকানো ঝুঁকি বের করে আনা যায়।

    বিশেষ করে বড় ঋণের ক্ষেত্রে forensic review চালু করা গেলে বোঝা যাবে, ঋণ অনুমোদনের সময় যথাযথ যাচাই হয়েছিল কি না, অর্থ কোথায় গেছে এবং কোনো related party পরোক্ষভাবে সুবিধা পেয়েছে কি না। এ ধরনের নিরীক্ষা শুধু অতীতের অনিয়ম শনাক্ত করার জন্য নয়; ভবিষ্যতে ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায়ও সতর্কতা বাড়াতে পারে।

    ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেনের ঝুঁকি কমাতে শুধু নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা নয়, আইনগত কাঠামোকেও আরও শক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকের তহবিল কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজের কিংবা অন্যের স্বার্থে ব্যবহার করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান যুক্ত করার উদ্যোগ রয়েছে বলে প্রথম আলো সূত্রে জানা গেছে। এর ফলে ব্যাংকের অর্থ অপব্যবহারের ক্ষেত্রে শুধু ঋণগ্রহীতার দায় নয়, অর্থ ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং অনিয়মে সহায়তাকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে ব্যাংকের ভেতরের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত কেউ জেনে-শুনে তহবিলের অপব্যবহারে সহযোগিতা করলে তাঁর দায় নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

    এই আইনি উদ্যোগের তাৎপর্য হলো, ব্যাংকের অর্থকে ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতার বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া। কোনো অনিয়মের ঘটনা সামনে এলে শুধু ঋণগ্রহীতা খেলাপি হয়েছেন কি না, সেটি দেখলে চলবে না; ঋণ অনুমোদনের সময় কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, কার প্রভাব ছিল এবং অর্থ শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে—এসব প্রশ্নও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।

    অন্যদিকে, ব্যাংকব্যবস্থার সংকটে সাধারণ আমানতকারীরা যাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়েও সুরক্ষা কাঠামো জোরদার করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে Deposit Insurance Trust Fund বিদ্যমান এবং এটি আমানতকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য পরিচালিত হয়। বর্তমানে কোনো insured bank অবসায়িত হলে একজন আমানতকারী একই অধিকার ও সক্ষমতায় সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত সুরক্ষার আওতায় পান।

    এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের কার্যক্রমে Deposit Protection Act 2026-সংক্রান্ত পৃথক নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ আমানতকারীর সুরক্ষাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও আধুনিক কাঠামোর মধ্যে আনার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে।

    এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থাকে কোনোভাবেই ব্যাংক পরিচালনায় অনিয়ম বা তহবিল অপব্যবহারের দায়মুক্তি হিসেবে দেখা যাবে না। একটি ব্যাংক দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর আমানতকারীর অর্থ রক্ষার ব্যবস্থা করার চেয়ে ব্যাংকটি কেন দুর্বল হলো, কার সিদ্ধান্তে ঝুঁকি তৈরি হলো এবং সেই ঝুঁকি শুরুতেই কেন ঠেকানো গেল না—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা বেশি জরুরি।

    সরকারের নতুন আইনি উদ্যোগ তাই শুধু শাস্তির বিধান তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে অনিয়মের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, সম্পদের প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণ, অর্থের গতিপথ অনুসরণ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

    ব্যাংক খাত সংস্কারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে এখানেই—নতুন বিধান কাগজে কতটা কঠোর, তা নয়; বরং বাস্তবে ব্যাংকের অর্থের অপব্যবহার কতটা প্রতিরোধ করা যাচ্ছে এবং অনিয়ম ঘটলে দায়ী ব্যক্তিকে কত দ্রুত জবাবদিহির আওতায় আনা যাচ্ছে।

    অনিয়ম শুধু বাইরে থেকে আসে না; ব্যাংকের ভেতরের দুর্বল নিয়ন্ত্রণও এর সুযোগ তৈরি করে। কোনো কর্মকর্তা যদি জানেন যে বড় ঋণের ক্ষেত্রে তাঁর সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে পর্যালোচনা হবে না, অথবা প্রভাবশালী গ্রাহকের বিষয়ে প্রশ্ন তুললে তাঁর ওপর চাপ আসতে পারে, তাহলে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কার্যকর থাকে না।

    তাই internal audit, compliance ও risk management বিভাগকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিতে হবে। অনিয়মের বিষয়ে আপত্তি তোলার কারণে কোনো কর্মকর্তাকে যেন পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে না হয়, সেই নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেনের তথ্য সরাসরি পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক regulatory framework-এ ব্যাংক পরিচালনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব বাড়ছে। এই কাঠামোর বাস্তব প্রয়োগ ছাড়া শুধু আইন দিয়ে স্বার্থের সংঘাত বন্ধ করা কঠিন।

    ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুর্বল ব্যাংককে সময়মতো শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান আইন ও বিধিমালার তালিকায় Bank Resolution Act, 2026 এবং Bank Resolution Ordinance, 2025 অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

    এর অর্থ হলো, কোনো ব্যাংক গুরুতরভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে তাকে শুধু চলতে দেওয়া বা শেষ পর্যন্ত আমানতকারীর অর্থ ঝুঁকিতে ফেলার পরিবর্তে পুনর্গঠন, নিয়ন্ত্রণ বা resolution-এর আওতায় আনার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হচ্ছে।

    তবে এই ব্যবস্থার সাফল্যও নির্ভর করবে প্রয়োগের নিরপেক্ষতার ওপর। কোনো প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতার পরিচয় যদি নিয়ম প্রয়োগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে নতুন আইনও পুরোনো সংস্কৃতি বদলাতে পারবে না। প্রয়োজন এমন একটি regulatory culture, যেখানে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব নয়, তথ্য, ঝুঁকি ও আইনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবে।

    এখন সবচেয়ে জরুরি হলো related-party lending শনাক্ত করার জন্য একটি সমন্বিত digital database তৈরি করা। ব্যাংকের পরিচালক, significant shareholder, UBO, তাঁদের পরিবারের সদস্য এবং নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করে CIB-এর সঙ্গে যুক্ত করা গেলে গোপন সম্পর্ক শনাক্ত করা সহজ হবে।

    একই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সব ঋণকে একত্রে বিবেচনা করে group exposure নির্ধারণ করতে হবে। বড় ঋণে independent credit review এবং নিয়মিত end-use monitoring বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে related-party transactions সহজ ভাষায় প্রকাশ করা দরকার, যাতে আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারেন ব্যাংকের অর্থ কার সঙ্গে কীভাবে লেনদেন হয়েছে।

    কোনো পরিচালক বা প্রভাবশালী ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট ঋণের সিদ্ধান্তে অংশ নিলে শুধু সেই সিদ্ধান্ত থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়; অনিয়মের প্রমাণ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ব্যক্তিগত দায়ও নির্ধারণ করতে হবে।

    একই সঙ্গে ব্যাংকের বড় ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় risk alert, transaction monitoring এবং সম্পর্কভিত্তিক exposure mapping চালু করা যেতে পারে। কোনো ঋণের অর্থ অনুমোদিত উদ্দেশ্যের বাইরে গেলে বা একই গোষ্ঠীর একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে ঘুরতে থাকলে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা তৈরি হওয়া উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একই অপরাধের ক্ষেত্রে সাধারণ গ্রাহক ও প্রভাবশালী গ্রাহকের জন্য যেন আলাদা মানদণ্ড না থাকে।

    বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু খেলাপি ঋণ কমানো নয়; ঋণ দেওয়ার সংস্কৃতিই বদলানো। কারণ দুর্বল ঋণ অনুমোদনের মাধ্যমে যে ক্ষতি তৈরি হয়, তা খেলাপি হওয়ার অনেক আগেই শুরু হয়ে যায়। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে মনে রাখতে হবে, ব্যাংকের অর্থ তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এটি জনগণের আমানত। সেই অর্থ ব্যবহারের ক্ষমতা একটি দায়িত্ব, ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত সুবিধা নেওয়ার সুযোগ নয়।

    একদিকে related-party transaction-এর জন্য নির্ধারিত সীমা ও সমান শর্তে লেনদেনের বিধান, অন্যদিকে UBO শনাক্তকরণ, AQR, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, Bank Resolution Act এবং Deposit Protection Act—সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতকে আরও জবাবদিহিমূলক করার জন্য একটি বিস্তৃত কাঠামো তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের তথ্য ও নির্দেশনাগুলোও দেখাচ্ছে যে সংস্কারের পরিধি এখন শুধু ঋণ নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ নেই; দুর্বল ব্যাংক মোকাবিলা এবং আমানতকারীর সুরক্ষাও এর অংশ হয়ে উঠছে।

    এখন আসল পরীক্ষা প্রয়োগের। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে ঋণ পাওয়ার পথ সহজ হবে—এই পুরোনো ধারণা বদলাতে হবে। বরং সম্পর্ক থাকলে যাচাই আরও কঠোর হবে, তথ্য আরও গভীরভাবে পরীক্ষা হবে এবং সিদ্ধান্ত আরও স্বচ্ছ হবে—এটাই হতে হবে নতুন নিয়ম।

    ব্যাংকের অর্থে কারও ব্যক্তিগত স্বার্থের জায়গা নেই। কারণ একটি অনিয়মিত ঋণের ক্ষতি শুধু ব্যাংকের মালিকের নয়; এর বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করেন আমানতকারী, সৎ উদ্যোক্তা, কর্মী এবং পুরো অর্থনীতি। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে তখনই, যখন ‘কে চেনে’ নয়, ‘কে যোগ্য’—এই প্রশ্নেই ঋণের সিদ্ধান্ত হবে। আর ব্যাংকের অর্থ কার স্বার্থে যাচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর কোনোভাবেই গোপন থাকার সুযোগ থাকবে না।

    Share. Facebook Twitter LinkedIn Email Telegram WhatsApp Copy Link

    সম্পর্কিত সংবাদ

    সম্পাদকীয়

    নিয়মের মারপ্যাচে  ব্যাংক থেকে বিশেষ মহলের ঋণ সুবিধা নেওয়া কি চলতেই  থাকবে?

    আগস্ট 9, 2026
    সম্পাদকীয়

    ব্যাংকিং খাতে আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ডিজিটাল উপায়ে অর্থ স্থানান্তর কি চলতে থাকবে?

    আগস্ট 8, 2026
    সম্পাদকীয়

    উপাচার্য নেই, মালিক আছে—বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অদৃশ্য ক্ষমতার গল্প

    আগস্ট 8, 2026
    একটি মন্তব্য করুন Cancel Reply

    সর্বাধিক পঠিত

    ইস্পাত শিল্প তীব্র সংকটে উৎপাদন বন্ধের পথে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    আইএমএফের রিপোর্টে ঋণের নতুন রেকর্ড পৌছালো ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    নতুন বাণিজ্য কৌশলে আরসেপে যুক্ত হতে চায় বাংলাদেশ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন আমেরিকান অর্থনীতিবিদ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024
    সংযুক্ত থাকুন
    • Facebook
    • Twitter
    • Instagram
    • YouTube
    • Telegram

    EMAIL US

    contact@citizensvoicebd.com

    FOLLOW US

    Facebook YouTube X (Twitter) LinkedIn
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement

    WhatsApp

    01339-517418

    Copyright © 2026 Citizens Voice All rights reserved

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.