বাংলাদেশে অর্থপাচার প্রতিরোধে শক্তিশালী আইন ও নীতিমালা থাকলেও ব্যাংকিং খাতে সেগুলোর বাস্তবায়নে বড় ধরনের বৈষম্য ও দুর্বলতা রয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক অর্থায়ন, রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং দেশের ব্যাংকিং খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টে অনুষ্ঠিত ‘ব্যাংকের বাণিজ্যসেবা কার্যক্রম’ শীর্ষক কর্মশালায় উপস্থাপিত গবেষণাপত্রে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির অধ্যাপক শাহ মোহাম্মদ আহসান হাবিব।
গবেষণায় বলা হয়, দেশের অনেক ব্যাংকে এখনো কেন্দ্রীভূত বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তের জন্য স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মূল্য যাচাইয়ের নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি, জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত বাণিজ্য সম্মতি কর্মকর্তার অভাব রয়েছে। ফলে বিদ্যমান অর্থপাচার প্রতিরোধ কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। এই ব্যবস্থায় কেবল নিয়ম মেনে চলার প্রমাণ দিলেই হবে না; বরং ঝুঁকি শনাক্ত, নিয়ন্ত্রণ, যথাসময়ে প্রতিবেদন দাখিল এবং পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সক্ষমতাও ব্যাংকগুলোকে দেখাতে হবে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে অর্থপাচার প্রতিরোধে অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন, বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার প্রতিরোধ নির্দেশিকা এবং জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের তৈরি গোএএমএল প্রতিবেদন ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। তবে আইন ও প্রযুক্তি থাকার পরও অনেক ব্যাংকে শক্তিশালী সম্মতি সংস্কৃতি গড়ে না ওঠায় কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না।
গবেষণাপত্রে আরও বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল গ্রাহক যাচাই, পণ্যের মূল্য যথাযথভাবে যাচাই না করা, প্রকৃত মালিকানা শনাক্তে ঘাটতি, শাখাভিত্তিক বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত, হাতে-কলমে নথি যাচাই এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, বাংলাদেশ ব্যাংক ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মধ্যে সীমিত সমন্বয় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অতিমূল্যায়ন, কম মূল্য দেখানো, ভুয়া চালান তৈরি, মূলধন পাচার এবং বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচারের মতো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যাংকারদের মতামতেও উঠে এসেছে, দুর্বল সম্মতি ব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে দেশের ব্যাংকগুলোর সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক ব্যাংক বিদেশি ঋণসুবিধা পেতে সমস্যায় পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদার ব্যাংকগুলো ঋণপত্রের নিশ্চয়তা দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। এতে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ব্যয় বাড়ছে এবং বৈদেশিক লেনদেন সম্পন্ন করাও কঠিন হয়ে উঠছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়, সম্মতি ব্যবস্থার দুর্বলতা এখন শুধু নিয়ন্ত্রক ঝুঁকির বিষয় নয়; এটি সরাসরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিষ্পত্তি, বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ, লেনদেন ব্যয় এবং বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর প্রভাব ফেলছে।
কর্মশালায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, দেশের কিছু ব্যাংক উচ্চমাত্রার সমস্যাজনিত সম্পদের চাপে রয়েছে, যার কারণে সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে। অন্য ব্যাংকগুলোও তাদের বিল কিনতে অনাগ্রহী হচ্ছে, কারণ নির্ধারিত সময়ে দায়বদ্ধতা পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নয়, পুরো দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা আমদানির ক্ষেত্রে প্রায়ই মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। এতে তাদের ব্যয় বেড়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হয়। তবে রপ্তানি খাতে, বিশেষ করে অপ্রচলিত পণ্যের ক্ষেত্রে এসব উদ্যোক্তার সাফল্য উল্লেখযোগ্য। ব্যাংকগুলো অগ্রিম অর্থায়ন, বিল ডিসকাউন্টিং এবং ব্যাক-টু-ব্যাক রপ্তানি অর্থায়নের মাধ্যমে তাদের সহায়তা করছে।
গবেষণাপত্রটি যৌথভাবে প্রস্তুত করেছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের শিক্ষক তোফায়েল আহমেদ, রাহাত বানু ও রাজিব কুমার দাস, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আরাফাত আলী এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের নির্বাহী সহসভাপতি এটিএম নেছারুল হক।
কর্মশালায় বিভিন্ন ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালকসহ ব্যাংকিং খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা অর্থপাচার প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, দক্ষ জনবল এবং শক্তিশালী সম্মতি সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

