একীভূত করা পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে ঋণ ও বিনিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়মের উৎস খুঁজে বের করতে বিশেষ ফরেনসিক অডিট পরিচালনা করছে সরকার। অডিটে যাঁদের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ মিলবে, তাঁদের চাকরি বাতিলসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকার ধারাবাহিক সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রোববার (১২ জুলাই) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলামের লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, ঋণ জালিয়াতি এবং বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার একটি সমন্বিত ব্যাংক রেজল্যুশন কাঠামো বাস্তবায়ন করছে। এই কাঠামোর অংশ হিসেবে সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, বিশেষ ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে এসব ব্যাংকের ঋণ ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে সংঘটিত অনিয়ম, দায়ী ব্যক্তি এবং আর্থিক অনিয়মের ধরন চিহ্নিত করা হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে চাকরি থেকে অপসারণ, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন হলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
লিখিত প্রশ্নে সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম জানতে চান, আগের সরকারের সময় ব্যাপক ঋণ জালিয়াতি, বেনামি ঋণ বিতরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। পাশাপাশি বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিসহ কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ও বেসরকারি ব্যাংকে নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল করতে সরকার বহুমাত্রিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এই সংস্কারের আইনি ভিত্তি হিসেবে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’, যার মাধ্যমে সংকটে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি জানান, এই আইনের আওতায় এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ (এক্সিম ব্যাংক), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে। সরকারের রেজল্যুশন কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, একীভূত হওয়ার ফলে পাঁচটি ব্যাংকের সব আমানতকারীর দাবি ও স্বার্থ নতুন ব্যাংকের মাধ্যমে সুরক্ষিত হয়েছে। পাশাপাশি ‘আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ অনুযায়ী সুরক্ষিত আমানতের সর্বোচ্চ সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে, যাতে সাধারণ গ্রাহকরা আরও বেশি সুরক্ষা পান।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার আওতায় অবসায়নাধীন ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত রেজল্যুশন স্কিম অনুযায়ী ধাপে ধাপে তাঁদের অর্থ ফেরত পাচ্ছেন। আগে যেসব ফাইন্যান্স কোম্পানির আমানতকারীরা আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থার বাইরে ছিলেন, তাঁদেরও এখন একই সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকের মূল ভিত্তি হলো আমানতকারীদের অর্থ। তাই সেই অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিচালনা পর্ষদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু বিভিন্ন অনিয়ম, অনৈতিক ঋণ বিতরণ এবং ব্যাংকের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এর প্রভাব পড়ে আমানতকারীদের আস্থার ওপর এবং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০২৪ সালের শেষ দিকে ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (২০২৩ পর্যন্ত সংশোধিত)-এর ৪৭(১) ও ৪৮(১) ধারার ক্ষমতাবলে ১১টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে আইনের ৪৫ ধারার অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংক মনোনীত পরিচালক ও স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়।
তিনি আরও জানান, পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের মার্চ, আগস্ট এবং ডিসেম্বর মাসে আরও পাঁচটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি বৃদ্ধি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

