দেশীয় উৎসের সুতা ও কাপড় ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নগদ সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সার্কুলার অনুযায়ী, এ খাতে বিকল্প নগদ সহায়তার হার ১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। নতুন এই হার গত ১ জুলাই থেকে জাহাজীকৃত রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জারি করা সার্কুলারে জানিয়েছে, রপ্তানিমুখী দেশীয় বস্ত্র খাতে শুল্ক বন্ড ও ডিউটি ড্র-ব্যাক সুবিধার বিকল্প হিসেবে দেওয়া নগদ সহায়তার হার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের ফলে দেশীয় সুতা ও কাপড় ব্যবহারকারী রপ্তানিকারক এবং স্থানীয় স্পিনিং মিল—উভয় খাতই উপকৃত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ সুবিধা পেতে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ অথবা সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনের সদস্য হতে হবে। পাশাপাশি দেশীয় উৎস থেকে সুতা ও কাপড় সংগ্রহের প্রমাণপত্রও জমা দিতে হবে। এসব শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ব্যাংকগুলো নতুন হারে নগদ সহায়তা প্রদান করবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের আগে দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ৪ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হতো। তবে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তিন ধাপে তা কমিয়ে ১ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।
এর পর থেকে দেশীয় সুতা ব্যবহারের প্রবণতা কমে যায় এবং অনেক স্পিনিং মিল উৎপাদন সংকটে পড়ে। একই সময়ে দেশের রপ্তানি আয়েও চাপ তৈরি হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে এক থেকে দুই সেন্ট মূল্য পার্থক্যও ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার কারণ হতে পারে। তাই নগদ সহায়তা বাড়ানোর ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে এবং স্থানীয় কাঁচামাল উৎপাদনও উৎসাহিত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, এলডিসি থেকে উত্তরণের পরিকল্পনার কারণে আগে ধাপে ধাপে নগদ সহায়তা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে সরকার জাতিসংঘের কাছে উত্তরণের সময় আরও তিন বছর বাড়ানোর আবেদন করেছে। এ কারণে চলতি অর্থবছরে কোনো রপ্তানি খাতে নগদ সহায়তা কমানো হয়নি। বরং দেশীয় বস্ত্র ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে সহায়তার হার বাড়ানো হয়েছে।
বর্তমানে সরকার তৈরি পোশাকসহ ৪৩টি পণ্য রপ্তানির বিপরীতে বিভিন্ন হারে নগদ সহায়তা দিয়ে থাকে। গত ৫ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের অধিকাংশ রপ্তানি প্রণোদনা অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা দিয়েছিল। এবার শুধু দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে সহায়তার হার বৃদ্ধি করা হলো।
নতুন সিদ্ধান্তের পরও ইউরো অঞ্চলে বস্ত্র রপ্তানির জন্য অতিরিক্ত শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ বিশেষ সহায়তা বহাল থাকবে। এছাড়া নিট, ওভেন ও সোয়েটারসহ তৈরি পোশাক খাতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য অতিরিক্ত ৩ শতাংশ সহায়তা, নতুন পণ্য বা নতুন বাজার সম্প্রসারণে ২ শতাংশ প্রণোদনা এবং তৈরি পোশাকের বিশেষ শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ নগদ সহায়তাও আগের মতো বহাল থাকবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার বাড়াতে এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এতে একদিকে দেশীয় বস্ত্রশিল্পের সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে রপ্তানিকারকের উৎপাদন ব্যয় কিছুটা কমে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।

