দেশের ব্যাংকিং খাতে সেবা গ্রহণের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। ব্যাংকারদের সংগঠন বাংলাদেশ ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (এবিবি) ব্যাংকিং সেবার জন্য নতুন ফি কাঠামোর প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জমা দিয়েছে। এতে ১৪টি নতুন সেবায় ফি চালুর পাশাপাশি বিদ্যমান অনেক সেবার চার্জ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে সাধারণ গ্রাহক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেড়ে যেতে পারে।
ব্যাংকগুলোর দাবি, গত কয়েক বছরে পরিচালন ব্যয়, প্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়ন, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের ব্যয় অনেক বেড়েছে। বর্তমান ফি কাঠামো দিয়ে সেই ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই ব্যাংকিং সেবার চার্জ পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংক খাতের অদক্ষতা, খেলাপি ঋণ এবং সুশাসনের ঘাটতির দায় সাধারণ গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না।
সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবটি হলো ব্যাংক কাউন্টার থেকে নগদ অর্থ উত্তোলনের ওপর ফি আরোপ। বর্তমানে গ্রাহকরা ব্যাংকের কাউন্টার থেকে বিনা খরচে অর্থ তুলতে পারেন। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যক্তিগত হিসাবধারীরা প্রতি মাসে প্রথম তিনবার বিনামূল্যে টাকা তুলতে পারবেন। এরপর চতুর্থ থেকে দশমবার পর্যন্ত প্রতিবার উত্তোলনে ১০০ টাকা এবং দশবারের বেশি হলে প্রতিবার ৩০০ টাকা ফি দিতে হবে। ব্যবসায়িক হিসাবের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতি মাসে প্রথম ২০টি উত্তোলন বিনামূল্যে থাকলেও ২১তম থেকে ৫০তম উত্তোলনের জন্য প্রতিবার ১০০ টাকা এবং ৫০টির বেশি উত্তোলনে প্রতিবার ১৫০ টাকা ফি দিতে হবে।
ব্যাংকগুলোর যুক্তি, এই পদক্ষেপ মানুষকে আরও বেশি ডিজিটাল লেনদেনের দিকে উৎসাহিত করবে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের বড় অংশের ব্যবসা এখনো নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
নতুন প্রস্তাবে এমন অনেক সেবার ওপরও ফি আরোপের কথা বলা হয়েছে, যেগুলো এতদিন বিনামূল্যে পাওয়া যেত। দীর্ঘদিন অচল থাকা হিসাব পুনরায় চালু করতে ৫০০ টাকা, হিসাবের স্থিতি নিশ্চিতকরণ সনদের জন্য ৩০০ টাকা, ঋণপত্র আবেদন গ্রহণে ১০০ টাকা এবং চলমান ঋণপত্র বাতিলে ৫০০ টাকা ফি নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। নথি সত্যায়ন ও প্রত্যয়ন সেবার জন্য সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন প্রয়োজন হয় এমন বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রেও নতুন চার্জ আরোপ করতে চায় ব্যাংকগুলো। এতে সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং করপোরেট গ্রাহকদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি ঋণ আগাম পরিশোধের ক্ষেত্রেও নতুন ব্যয় যুক্ত হতে পারে। বর্তমানে এ ধরনের কোনো ফি না থাকলেও ভবিষ্যতে বকেয়া ঋণের ওপর ১ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সঞ্চয়ী হিসাব পরিচালনার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত গড় স্থিতি থাকলে রক্ষণাবেক্ষণ ফি থেকে ছাড় পাওয়া যায়। নতুন প্রস্তাবে সেই সীমা কমিয়ে ৫ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা গড় স্থিতি থাকলে মাসে ১৫০ টাকা এবং ২৫ হাজার টাকার বেশি থাকলে মাসে ৩০০ টাকা রক্ষণাবেক্ষণ ফি নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এতে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন এবং ব্যাংকে সঞ্চয় রাখার আগ্রহও কমে যেতে পারে।
ঋণসংক্রান্ত প্রায় সব ধরনের চার্জও বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। ঋণ প্রক্রিয়াকরণ ফি সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের ফি শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া বকেয়া ঋণের ওপর প্রতিবছর সর্বোচ্চ ১ শতাংশ ব্যবস্থাপনা বা তদারকি ফি আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে, যদিও এই ফি সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।
বড় করপোরেট ঋণ ও বাণিজ্যিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১ শতাংশ কাঠামো ফি, ঋণের সুদের বাইরে ১ শতাংশ ঝুঁকি প্রিমিয়াম এবং আমদানিকারকদের ক্রেতা ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরও ১ শতাংশ চার্জ আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে ক্ষুদ্র, কুটির, মাঝারি শিল্প এবং কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে কিছু ফি থেকে ছাড় রাখার সুপারিশও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ব্যাংকিং ব্যয় বাড়তে পারে। ঋণপত্র সংশোধনের ফি ৭৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক গ্যারান্টির সর্বোচ্চ কমিশন শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন কমিশন ১ হাজার টাকা থেকে ২ হাজার টাকা করার সুপারিশ রয়েছে। পাশাপাশি সচ্ছলতা সনদের ফি ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা, চেক ফেরতের চার্জ ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা, চেকে অর্থ প্রদান স্থগিতের ফি ১০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা এবং পে-অর্ডার ইস্যুর ফি ৩০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিদেশি ঋণপত্রের নথি প্রক্রিয়াকরণে সর্বোচ্চ ২০ মার্কিন ডলার এবং দেশীয় ঋণপত্রের নথির জন্য সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নির্ধারণেরও সুপারিশ করা হয়েছে।
এবিবি বলছে, দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমান ফি কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে সব ব্যাংকের জন্য একটি অভিন্ন সর্বোচ্চ ফি কাঠামো নির্ধারণ এবং মূল্যস্ফীতি ও পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি বছর সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ সমন্বয়ের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও করেছে সংগঠনটি।
বর্তমানে প্রস্তাবটি বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনায় রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলে এটি অনুমোদন, সংশোধন অথবা সম্পূর্ণ বাতিল করতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের বড় অংশের মানুষ এখনো নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, প্রবীণ নাগরিক এবং ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে অনভ্যস্ত গ্রাহকদের জন্য কাউন্টার থেকে টাকা তোলার ওপর ফি আরোপ নতুন আর্থিক চাপ তৈরি করবে। তাদের মতে, ব্যাংকিং সেবার ব্যয় বাড়লে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়ার মাধ্যমে সাধারণ ভোক্তার ওপরই পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে অতিরিক্ত চার্জ আরোপের পরিবর্তে প্রণোদনা দেওয়া বেশি কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ কমানো, ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং পরিচালন অদক্ষতা দূর করার মাধ্যমে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনাই হবে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

