রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধের পর ২৫৭ কর্মকর্তার চাকরি অবসানের প্রক্রিয়া, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের আরোপিত শর্ত যথাযথভাবে মানা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এইচএসবিসি বাংলাদেশের কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৪ কার্যদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য, দালিলিক প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে।
চলতি মাসে পাঠানো বাংলাদেশ ব্যাংকের এক চিঠিতে বলা হয়েছে, গুলশান, ধানমন্ডি ও চট্টগ্রামের জিইসি সার্কেল শাখায় রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধের ফলে যেসব কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছেন, তাদের আর্থিক সুবিধা ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে শর্ত দিয়েছিল, তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিতে হবে।
চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের একাধিক আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা এবং এইচএসবিসির নিজস্ব বৈশ্বিক নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। তাদের দাবি, বাংলাদেশে দেওয়া ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ একই ধরনের পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশে দেওয়া সুবিধার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক আগের বিভিন্ন সময় দেওয়া ক্ষতিপূরণ এবং বর্তমান প্যাকেজের তুলনামূলক তথ্য চেয়েছে। একই সঙ্গে কী ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে দালিলিক প্রমাণও জমা দিতে বলা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানতে চেয়েছে, চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের দিয়ে কেন বাধ্যতামূলকভাবে ‘ডিক্লারেশন অব রিলিজ অ্যান্ড ডিসচার্জ’ নামে একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। ওই ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে কর্মীদের ভবিষ্যতে আইনগত দাবি উত্থাপনের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি তিনটি শাখা বন্ধের অনুমোদনের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক যে শর্ত আরোপ করেছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতির বিস্তারিত প্রতিবেদনও চাওয়া হয়েছে।
চাকরি হারানো কর্মকর্তাদের দাবি, চলতি মাসের ৪ তারিখে তাদের সর্বোচ্চ ১৫ মাসের বেতনের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এইচএসবিসি বিশ্বের অন্যান্য দেশে একই ধরনের পুনর্গঠনের সময় অনেক বেশি সুবিধা দিয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে সর্বোচ্চ ১২০ মাসের বেতন এবং শ্রীলঙ্কায় ৮৪ মাসের বেতনের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল। সেই তুলনায় বাংলাদেশে দেওয়া সুবিধা বৈষম্যমূলক এবং অযৌক্তিক বলে তারা মনে করেন।
কর্মীদের অভিযোগ, পুরো প্রক্রিয়ায় শ্রম আইন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। তাদের ভাষ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো নথিতে চাকরি হারানো কর্মকর্তাদের ‘ছাঁটাইকৃত’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া চিঠিতে শ্রম আইনের ২৬ ধারার আওতায় সাধারণ চাকরিচ্যুতির কথা বলা হয়েছে। এর ফলে ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য আইনগত সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছেন বলে দাবি করেন তারা।
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একযোগে ২৫৭ কর্মকর্তার চাকরির অবসান ঘটে। তাদের মধ্যে অনেকেই ১৫ থেকে ২৫ বছর ধরে ব্যাংকটিতে দায়িত্ব পালন করছিলেন। দীর্ঘ সময় কর্মরত থাকার পরও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় তারা নিজেদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন।
চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের আরও দাবি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়ার জন্য এইচএসবিসি এক ধরনের তথ্য উপস্থাপন করলেও কর্মীদের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। বিষয়টিকে তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগ পাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছিল। তবে আদালতে এইচএসবিসি দাবি করেছে, ওই নির্দেশনা বাধ্যতামূলক নয়। এতে দেশের ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার কার্যকারিতা ও কর্তৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা।
এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা তলবের মাধ্যমে বিষয়টি এখন আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনার পর্যায়ে গেছে। এইচএসবিসির জবাব, দাখিল করা নথিপত্র এবং আইনগত অবস্থান পর্যালোচনার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

