বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মুনাফা করেছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত বা নিট মুনাফার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকায়, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বেশি। এই মুনাফা বৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দুর্বল ব্যাংকগুলোর উচ্চ সুদে ধার নেওয়ার প্রবণতা—তারল্যসংকটে পড়া এসব ব্যাংক দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাড়তি হারে ঋণ নিয়েছে।
রোববার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে গত অর্থবছরের চূড়ান্ত আর্থিক হিসাব অনুমোদিত হয়। একই বৈঠকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি বড় সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে—মূল বেতনের ছয় গুণ পরিমাণ পারফরম্যান্স বা প্রণোদনা বোনাস অনুমোদন করেছে পর্ষদ। অর্থাৎ কার্যত ছয় মাসের সমপরিমাণ বাড়তি বোনাস পেতে যাচ্ছেন সংস্থাটির কর্মীরা।
নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার অর্জিত মুনাফার পুরোটাই সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে থাকে। এরই মধ্যে সরকার ১০ হাজার কোটি টাকা পেয়ে গেছে, বাকি প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা শিগগির জমা হবে। এই অর্থ সরকারের উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, তার আগের অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ২২ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। সেই হিসেবে সাম্প্রতিক অর্থবছরে মুনাফায় স্পষ্ট উল্লম্ফন ঘটেছে। আরও পেছনে ফিরলে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গ্রস মুনাফা প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা হলেও নিট মুনাফা ছিল ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকার মতো।
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সামগ্রিক অর্থনীতিতে মন্থরতা থাকলেও ঋণ কার্যক্রমের দিক থেকে গত অর্থবছরটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য ছিল বেশ সক্রিয়। ব্যাংক খাতে তারল্যসংকট প্রকট হওয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি হারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে, আর এই ঋণের সুদ থেকেই মূলত বিপুল আয় হয়েছে। এর বাইরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটি অংশ আন্তর্জাতিক বন্ড ও বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করা থাকায়, বৈশ্বিক সুদহার বৃদ্ধির সুবাদে সেখান থেকেও অতিরিক্ত আয় যুক্ত হয়েছে সামগ্রিক মুনাফায়।
তবে আর্থিক খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, মুনাফা অর্জন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল কাজ নয়। বরং ব্যাংক খাতের কার্যকর তদারকি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিই এর মূল দায়িত্ব বলে বিবেচিত হয়। তাদের পর্যবেক্ষণ, এবারের রেকর্ড মুনাফার পেছনে মূলত অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের অস্থির পরিস্থিতিই বড় ভূমিকা রেখেছে—যা কোনো ইতিবাচক অর্জনের চেয়ে বরং খাতের দুর্বলতারই প্রতিফলন। তাই মুনাফার এই প্রবৃদ্ধিতে সন্তুষ্ট না হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেন তার মূল দায়িত্ব—মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষা—থেকে বিচ্যুত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

