ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারের সঙ্গে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সিটি ব্যাংক ও বিকাশের যৌথ উদ্যোগে চালু হওয়া ‘ন্যানো’ ঋণসেবা। স্মার্টফোনে কয়েক মিনিটের মধ্যেই জামানত ছাড়াই ক্ষুদ্রঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ লাখ গ্রাহক এই সেবা ব্যবহার করছেন।
সেবা চালুর সাড়ে চার বছরে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা দেশের ডিজিটাল ঋণসেবার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সিটি ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে চালু হওয়া এ সেবার আওতায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৫ লাখ গ্রাহক ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে ৩ কোটি ১৯ লাখের বেশি ঋণ হিসাবের মাধ্যমে অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, একজন গ্রাহক গড়ে নয়বারেরও বেশি এই ঋণসুবিধা গ্রহণ করেছেন, যা সেবাটির পুনঃব্যবহারের উচ্চ হার নির্দেশ করে।
প্রতিবছরই ঋণ বিতরণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সেবা চালুর প্রথম বছরে বিতরণ করা হয়েছিল ১০১ কোটি টাকা। দ্বিতীয় বছরে তা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯৪ কোটি টাকায়। ২০২৪ সালে বিতরণ হয় ৮৫৫ কোটি টাকা। এরপর ২০২৫ সালে ঋণ বিতরণ প্রায় সাড়ে চার গুণ বেড়ে ৩ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকায় পৌঁছে। চলতি বছরের ৯ জুলাই পর্যন্ত আরও ৪ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা বিতরণ হওয়ায় মোট ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে।
বর্তমানে বিকাশের ১ কোটি ২০ লাখের বেশি গ্রাহক এই ঋণসেবা ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন। প্রতিটি ঋণের গড় পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার টাকা। মাসে গড়ে প্রায় ৯০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ হচ্ছে, যা ক্ষুদ্রঋণের ডিজিটাল চাহিদা দ্রুত বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে সিটি ব্যাংক বর্তমানে তিন ধরনের ডিজিটাল ঋণসেবা দিচ্ছে। এগুলো হলো নগদ ঋণ, ‘বাই নাও, পে লেটার’ এবং মোবাইল রিচার্জের জন্য ‘পে লেটার’। এর মধ্যে মোট বিতরণ হওয়া ঋণের প্রায় ৯৯ শতাংশই নগদ ঋণ, যা গ্রাহকদের তাৎক্ষণিক অর্থের চাহিদা পূরণে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
গ্রাহক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঋণগ্রহীতাদের ৬৩ শতাংশ শহরাঞ্চলের এবং ৩৭ শতাংশ গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দা। লিঙ্গভিত্তিক হিসাবে ৭৮ শতাংশ ঋণগ্রহীতা পুরুষ এবং ২২ শতাংশ নারী। এতে বোঝা যায়, ডিজিটাল ঋণসেবা শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে, যদিও নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
এই ঋণসেবার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো খেলাপি ঋণের হার অত্যন্ত কম। ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণের বিপরীতে খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ মাত্র ৫৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণের প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ খেলাপি হয়েছে এবং প্রায় ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ ঋণ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পরিশোধ করা হয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাতে যেখানে খেলাপি ঋণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে এই হারকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের চাপ বাড়লেও ছোট অঙ্কের প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল ঋণ ব্যবস্থাপনায় সন্তোষজনক ফল পাওয়া যাচ্ছে। তার মতে, এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে ঋণ মূল্যায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।
বিকাশের প্রধান বাণিজ্য কর্মকর্তা আলী আহম্মেদ বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি, বিকল্প তথ্যের ভিত্তিতে গ্রাহকের ঋণ সক্ষমতা মূল্যায়ন এবং সুশাসনভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সমন্বয়ে একটি কার্যকর ডিজিটাল ঋণ মডেল গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের মাইলফলক প্রমাণ করে যে, সহজ, স্বচ্ছ ও দ্রুত ডিজিটাল আর্থিক সেবা দেশের সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষুদ্র অঙ্কের জামানতবিহীন ডিজিটাল ঋণ দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং জরুরি অর্থের প্রয়োজন হওয়া গ্রাহকদের জন্য এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর ঋণসেবা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

