চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতে আমানতের পরিমাণ কমলেও ঋণ বা বিনিয়োগ বিতরণ বেড়েছে। একই সময়ে রপ্তানি আয়, আমদানি নিষ্পত্তি এবং প্রবাসী আয় সংগ্রহেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে উঠে আসা এসব তথ্য ইসলামী ব্যাংকিং খাতের অর্থপ্রবাহে এক ধরনের মিশ্র চিত্র তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ক সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৯ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ১১ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। ফলে মাত্র তিন মাসে এসব ব্যাংকের আমানত ২ হাজার ১২ কোটি টাকা কমেছে।
শুধু পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক নয়, পুরো ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থাতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। মার্চ শেষে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিক শেষে ছিল ৪ লাখ ৮১ হাজার ১৯২ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে এ খাতে মোট আমানত কমেছে ১ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা।
বর্তমানে দেশের মোট ব্যাংক আমানতের ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। অর্থাৎ দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আমানত এখনও ইসলামী ব্যাংক ও তাদের ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে আমানতের প্রবাহ কমলেও অর্থায়ন কার্যক্রমে গতি অব্যাহত রয়েছে। মার্চ শেষে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ বা বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ২৬ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। আগের প্রান্তিক শেষে এ পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ২৫ হাজার ৭১ কোটি টাকা। ফলে তিন মাসে ঋণ বা বিনিয়োগ বেড়েছে ১ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ব্যাংকঋণের প্রায় ২৯ শতাংশই বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বিতরণ হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, অর্থায়নের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকগুলোর ভূমিকা এখনও উল্লেখযোগ্য।
প্রতিবেদনে বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স প্রবাহেও কিছুটা দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩০ হাজার ৩২১ কোটি টাকা। আগের প্রান্তিকে এই পরিমাণ ছিল ৩১ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা।
একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আমদানি নিষ্পত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা, যা আগের তিন মাসে ছিল ৪৭ হাজার ৭ কোটি টাকা। ফলে আমদানি বাণিজ্যেও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ২৫ হাজার ১১ কোটি টাকার প্রবাসী আয় দেশে এসেছে। এটি দেশের মোট রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রায় ২০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়া ১৭টি প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী শাখা এবং ২১টি ব্যাংকের ইসলামী উইন্ডোর মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা দেওয়া হচ্ছে।
২০২৬ সালের মার্চ শেষে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে মোট কর্মরত জনবলের সংখ্যা ছিল ৪৮ হাজার ৯৩৫ জন। ফলে কর্মসংস্থান, ঋণ বিতরণ এবং আমানত ব্যবস্থাপনায় ইসলামী ব্যাংকিং এখনও দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম বড় অংশ হিসেবে ভূমিকা রেখে চলেছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, তারল্য সংকট এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে গেলেও ঋণ বিতরণ অব্যাহত থাকায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়তে পারে। তাই আমানত সংগ্রহ বাড়ানো, তহবিল ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ করা এবং বৈদেশিক লেনদেনে গতি ফেরানো আগামী সময়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

