মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকলেও দেশের ভোক্তাদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। দৈনন্দিন কেনাকাটা, ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন ছাড় ও অফার এবং কার্ডভিত্তিক লেনদেনের বিস্তারের কারণে মে মাসে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৩.১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে দেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা, যা এপ্রিল মাসে ছিল ৩ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে ১০.৮৫ শতাংশ।
আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৫ সালের মে মাসে যেখানে অভ্যন্তরীণ ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা, সেখানে এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৮৮ কোটি টাকায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মে মাসে দেশের অভ্যন্তরে হওয়া মোট ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের প্রায় অর্ধেকই হয়েছে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। এতে বোঝা যায়, ভোক্তারা দৈনন্দিন কেনাকাটা ও খুচরা বাজারে আগের তুলনায় বেশি পরিমাণে কার্ড ব্যবহার করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংকগুলোর ক্যাশব্যাক ও মূল্যছাড়ের অফার, বড় বিপণিবিতানে সহজে কার্ড ব্যবহারের সুযোগ এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসার—এসব কারণ ক্রেডিট কার্ড লেনদেন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
দেশের বাইরে বাংলাদেশি কার্ডধারীদের ব্যয়ও ঊর্ধ্বমুখী ছিল। মে মাসে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮১২ কোটি টাকা, যা এপ্রিল মাসের ৮০০ কোটি টাকা থেকে ১.৫৭ শতাংশ বেশি।
বিদেশে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ডে ব্যয়ের পরিমাণ মে মাসে ছিল ৪২৪ কোটি টাকা, যা আগের মাসের ৪২৫ কোটি টাকার প্রায় সমান। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই ব্যয় ৯.৯৬ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ইস্যু করা কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে হওয়া লেনদেন কিছুটা কমেছে। মে মাসে এই খাতে ব্যয় হয়েছে ৩১২ কোটি টাকা, যা এপ্রিলের ৩২৯ কোটি টাকা থেকে ৪.৯৫ শতাংশ কম। তবে বার্ষিক হিসাবে এই খাতে প্রবৃদ্ধি রয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে বিদেশি কার্ডধারীদের ব্যয় ছিল ২৭৭ কোটি টাকা, যা এক বছরে ১২.৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ইতিবাচক প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শেষে দেশে অনুমোদিত মোট ক্রেডিট কার্ডের ঋণসীমা দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ১ কোটি টাকা। একই সময়ে বকেয়া ক্রেডিট কার্ড ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা, যা ইঙ্গিত দেয় যে পরিবারভিত্তিক ব্যয় নির্বাহে ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভরতা এখনো বাড়ছে।
বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যয়ের গন্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, যার অংশ ১৭.০৩ শতাংশ। এরপর রয়েছে যুক্তরাজ্য (৯.০৬ শতাংশ), থাইল্যান্ড (৮.৮৫ শতাংশ), সিঙ্গাপুর (৭.৮১ শতাংশ), সৌদি আরব (৭.৪৭ শতাংশ), ভারত (৬.৮৯ শতাংশ), মালয়েশিয়া (৫.০৮ শতাংশ), নেদারল্যান্ডস (৪.৮৯ শতাংশ), চীন (৪.৭৮ শতাংশ), কানাডা (৪.০৩ শতাংশ), অস্ট্রেলিয়া (৩.৯৩ শতাংশ) এবং আয়ারল্যান্ড (৩.৫১ শতাংশ)। বাকি ১৬.৬৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে বিশ্বের অন্যান্য দেশে।
বিশেষভাবে লক্ষণীয়, সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যয়ের অংশ এক মাসের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এপ্রিল মাসে যেখানে মোট আন্তর্জাতিক ব্যয়ের ৩.৯৪ শতাংশ সৌদি আরবে হয়েছিল, মে মাসে তা বেড়ে ৭.৪৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ধারাবাহিক বৃদ্ধি একদিকে যেমন ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের প্রসারকে নির্দেশ করে, অন্যদিকে এটি ভোক্তাদের ব্যয় প্রবণতা ও ঋণনির্ভর ভোগের প্রবণতাও তুলে ধরে। তাই ভবিষ্যতে এই প্রবৃদ্ধি টেকসই রাখতে দায়িত্বশীল ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং সচেতন ব্যয় পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

